হাওয়া(আ.) এর জন্যই কি নারীরা স্বামীর সাথে বেঈমানী করে? নারীরা কি সব দুর্দশার মূল?

হাওয়া(আ.) এর জন্যই কি নারীরা স্বামীর সাথে বেঈমানী করে? নারীরা কি সব দুর্দশার মূল?

15 বার দেখা হয়েছে
শেয়ার করুন:

 

অভিযোগঃ

আব্রাহামিক বিশ্বাস অনুযায়ী স্বর্গে আদি মানব আদম (Adam)কে নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের ক্ষেত্রে প্ররোচনা দিয়েছিল তার স্ত্রী হাওয়া (Eve) স্বর্গ থেকে বিতারনের জন্য দোষী হল হাওয়া অর্থাৎ নারী। আবার, হাদিসে বলা হয়েছে আদি মানবী হাওয়ার কারণেই পৃথিবীর সব নারী তাদের স্বামীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। এভাবে ইসলামে একের কাজের জন্য অন্যকে দোষী করা হয়। ইসলামে আদি মানবীকে সব কিছুর জন্য দোষী তথা নারীদেরকে সকল দুর্দশার মূল বানানো হয়েছে।

 

জবাবঃ

অভিযোগকারীরা তাদের দাবির স্বপক্ষে নিম্নের হাদিসগুলো পেশ করে—

 

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم نَحْوَهُ يَعْنِي ‏ "‏ لَوْلاَ بَنُو إِسْرَائِيلَ لَمْ يَخْنَزِ اللَّحْمُ، وَلَوْلاَ حَوَّاءُ لَمْ تَخُنْ أُنْثَى زَوْجَهَا ‏"‏‏.

অর্থঃআবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নবী () থেকে অনুরূপ বর্ণিত আছে। অর্থাৎ নবী () বলেছেন, বনী ইসরাঈল যদি না হত তবে মাংস দুর্গন্ধযুক্ত হতো না। আর যদি হাওয়া (আ.) না হতেন তবে কোন নারীই তাঁর স্বামীর খেয়ানত করত না।[1]

 

عَنْ هَمَّامِ بْنِ مُنَبِّهٍ، قَالَ هَذَا مَا حَدَّثَنَا أَبُو هُرَيْرَةَ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَذَكَرَ أَحَادِيثَ مِنْهَا وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ "‏ لَوْلاَ بَنُو إِسْرَائِيلَ لَمْ يَخْبُثِ الطَّعَامُ وَلَمْ يَخْنَزِ اللَّحْمُ وَلَوْلاَ حَوَّاءُ لَمْ تَخُنْ أُنْثَى زَوْجَهَا الدَّهْرَ ‏"

অর্থঃ "হাম্মাদ ইবনু মুনাব্বিহ (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এ হল রসূলুল্লাহ () হতে আমাদের কাছে আবূ হুরায়রাহ্ (রাযিঃ) এর বর্ণিত হাদীস। তিনি অনেক হাদীস উল্লেখ করেছেন। তার মাঝে অন্যতম ..... রসূলুল্লাহ () আরো বলেছেনঃ বানূ ইসরাঈলীরা না হলে খাদ্য নষ্ট হত না এবং মাংস বিকৃত দুৰ্গন্ধযুক্ত হত না এবং হাওয়া (আঃ) না হলে যুগ যুগান্তরে কোন নারী তার স্বামীর বিশ্বাস ভঙ্গ করত না।" [2]

 

জান্নাত থেকে মানবজাতির বিতারনের জন্য কে দায়ী?

জান্নাত থেকে মানবজাতির বিতারনের জন্য এককভাবে হাওয়া(আ.) দায়ী – এমন কথা কুরআন বা সহীহ হাদিসের কোথাও বলা হয়নি। বরং এমন কথা আছে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থে। বাইবেলের আদিপুস্তকে বলা হয়েছে –

 

1 প্রভু ঈশ্বর যত রকম বন্য প্রাণী সৃষ্টি করেছিলেন সে সবগুলোর মধ্যে সাপ সবচেয়ে চালাক ছিল। সাপ সেই নারীর সঙ্গে একটা চালাকি করতে চাইল। একদিন সাপটা সেই নারীকে জিজ্ঞেস করল, “নারী, ঈশ্বর কি বাগানের কোনও গাছের ফল না খেতে সত্যিই আদেশ দিয়েছেন?” 2 তখন নারী সাপটাকে বলল, “না! ঈশ্বর তা বলেন নি! বাগানের সব গাছগুলো থেকে আমরা ফল খেতে পারি। 3 শুধু একটি গাছ আছে যার ফল কিছুতেই খেতে পারি না। ঈশ্বর আমাদের বলেছিলেন, ‘বাগানের মাঝখানে যে গাছটা আছে, তার ফল কোনমতেই খাবে না। এমন কি ঐ গাছটা ছোঁবেও না—ছুঁলেই মরবে।’” 4 কিন্তু সাপটা নারীকে বলল, “না, মরবে না। 5 ঈশ্বর জানেন, যদি তোমরা ঐ গাছের ফল খাও তাহলে তোমাদের ভালো আর মন্দের জ্ঞান হবে। আর তোমরা তখন ঈশ্বরের মত হয়ে যাবে!” 6 সেই নারী দেখল গাছটা সুন্দর এবং এর ফল সুস্বাদু, আর এই ভেবে সে উত্তেজিত হল যে ঐ গাছ তাকে জ্ঞান দেবে। তাই নারী গাছটার থেকে ফল নিয়ে খেল। তার স্বামী সেখানেই ছিল, তাই সে স্বামীকেও ফলের একটা টুকরো দিল আর তার স্বামীও সেটা খেল।

...

11 প্রভু ঈশ্বর মানুষটিকে বললেন, “কে বলল যে তুমি উলঙ্গ? তোমার লজ্জা করছে কেন? যে গাছটার ফল খেতে আমি বারণ করেছিলাম তুমি কি সেই বিশেষ গাছের ফল খেয়েছ?” 12 সেই পুরুষ বলল, “আমার জন্য যে নারী আপনি তৈরী করেছিলেন সেই নারী গাছটা থেকে আমায় ফল দিয়েছিল, তাই আমি সেটা খেয়েছি।

16 তারপর প্রভু ঈশ্বর নারীকে বললেন, “তুমি যখন গর্ভবতী হবে, আমি সেই দশাটাকে দুঃসহ করে তুলব, তুমি অসহ্য ব্যথায় সন্তানের জন্ম দেবে। তুমি তোমার স্বামীকে আকুলভাবে কামনা করবে কিন্তু সে তোমার উপরে কর্তৃত্ত্ব করবে।[3]

 

অর্থাৎ বাইবেলের দাবি অনুযায়ী আদি নারী হাওয়া বা ইভ আদি মানব আদমকে সাপ (বা শয়তান) এর প্ররোচনায় পড়ে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খেতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। শয়তানের ফাঁদে পড়েছিল ইভ। আর এর ফলেই মানবজাতি আদনের উদ্যান (Garden of Eden) থেকে বিতাড়িত হয়েছে। ঈশ্বর এ কারণে আদি মানবীকে শাস্তি দেন যে, সে জীবনের একটা পর্যায়ে গর্ভবতী হবে। আর গর্ভবতী হবার পরে স্বামী তার উপর খবরদারী করবে। আর এরই ধারাবাহিকতায় নারীজাতি গর্ভধারণ করে আসছে। বাইবেলের পুরাতন নিয়ম (Old Testament) এর এই পুস্তকগুলো ইহুদি ও খ্রিষ্টান উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থ। আর বাইবেল অনুসারে তাদের বিশ্বাস হল - গর্ভধারন একটি পাপের শাস্তি, নাউযুবিল্লাহ।

 

নারীজাতি কি আজন্ম আদিপাপের শাস্তি বহনকারী বা অভিশপ্ত?

ইসলামে আদিপাপ বলে কিছুই নেই বরং ইসলামে প্রত্যেক নবজাতক নিষ্পাপ হিসেবে জন্ম নেয়, কেউ কারো কোনো কাজের বা পাপের ভার বহন করে না (সামনে বিস্তারিত আলোচনা থাকছে)। কুরআন বা সহীহ হাদিসে কোথাও গর্ভধারণকে অভিশাপ বা পাপের শাস্তি বলা হয়নি। বরং আল কুরআনে মায়েরা কী কষ্টের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেয় সেই কথা উল্লেখ করে কৃতজ্ঞ আচরণ করতে বলা হয়েছে –

 

وَ وَصَّیۡنَا الۡاِنۡسَانَ بِوَالِدَیۡهِ ۚ حَمَلَتۡهُ اُمُّهٗ وَهۡنًا عَلٰی وَهۡنٍ وَّ فِصٰلُهٗ فِیۡ عَامَیۡنِ اَنِ اشۡكُرۡ لِیۡ وَ لِوَالِدَیۡكَ ؕ اِلَیَّ الۡمَصِیۡرُ

অর্থঃআমি তো মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। জননী কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে এবং তার স্তন্যপান ছাড়াতে দু বছর অতিবাহিত হয়। সুতরাং তুমি আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। আমারই নিকট (সকলের) প্রত্যাবর্তন।[4]

 

আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে আহসানুল বায়ান এ বলা হয়েছে –

 

উদ্দেশ্য এই যে, মাতৃগর্ভে বাচ্চা যত বাড়ে, মায়ের উপর কষ্টের বোঝা তত বাড়তে থাকে, যার ফলে মা দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে। মায়ের কষ্টের কথা উল্লেখে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, পিতা-মাতার অধিকার আদায় করার সময় মাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যেমন হাদীসেও সে কথা বর্ণিত হয়েছে

 

আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে জাকারিয়াতে বলা হয়েছে –

 

এখানে যখন পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য পালন এবং তাদের কৃতজ্ঞতা স্বীকারের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, তখন এর হেকমত ও অন্তর্নিহিত রহস্য এই বর্ণনা করেছেন যে, তার মা ধরাধামে তার আবির্ভাব ও অস্তিত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে অসাধারণ ত্যাগ স্বীকার ও অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট বরদাশত করেছেন। নয় মাস কাল উদরে ধারণ করে তার রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন এবং এ কারণে ক্রমবর্ধমান দুঃখ-কষ্ট বরদাশত করেছেন। আবার ভূমিষ্ট হওয়ার পরও দু’বছর পর্যন্ত স্তন্যদানের কঠিন ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। যাতে দিন-রাত মাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। ফলে তার দুর্বলতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। আর সন্তানের লালন-পালন করার ক্ষেত্রে মাকেই যেহেতু অধিক বুকি-ঝামেলা বহন করতে হয়, সেজন্য শরীয়তে মায়ের স্থান ও অধিকার পিতার অগ্রে রাখা হয়েছে। যদি পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা না হয় তাতে আল্লাহরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয় না। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে কেউ মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ হয় না সে আল্লাহর কাছেও কৃতজ্ঞ হতে পারে না।” [আবু দাউদ: ৪৮১১, তিরমিযী: ১৯৫৪, মুসনাদে আহমাদ: ২/২৯৫][5]

 

জান্নাতে শয়তান কাকে ধোঁকা দিয়েছিল? আদম(আ.)কে নাকি হাওয়া(আ.)কে?

আল কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী জান্নাতে অবস্থানকালে হাওয়া(আ.)কে এককভাবে না বরং শয়তান আদম(আ.) ও হাওয়া(আ.) উভয়কেই ধোঁকা দিয়েছিল। কুরআনে একটি আয়াত থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে শয়তান প্রথম কুমন্ত্রণা আদম(আ.)কেই দিয়েছিল এবং তাঁকে উদ্দেশ্য করেই মন ভুলানো কথা বলেছিল। হাওয়া(আ.) তাঁকে অনুসরণ করেছিলেন। আর এ কারণেই সেই অবাধ্যতা প্রসঙ্গে এককভাবে সম্বোধনের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা’আলা আদম(আ.)কে সম্বোধন করেছেন। হাওয়া(আ.)কে নয়।

 

فَوَسۡوَسَ اِلَيۡهِ الشَّيۡطٰنُ قَالَ يٰۤاٰدَمُ هَلۡ اَدُلُّكَ عَلٰى شَجَرَةِ الۡخُلۡدِ وَمُلۡكٍ لَّا يَبۡلٰى‏ ١٢٠ فَاَكَلَا مِنۡهَا فَبَدَتۡ لَهُمَا سَوۡاٰ تُہُمَا وَطَفِقَا يَخۡصِفٰنِ عَلَيۡهِمَا مِنۡ وَّرَقِ الۡجَـنَّةِ وَعَصٰۤى اٰدَمُ رَبَّهٗ فَغَوٰىۖ‏ ١٢١

অর্থঃ"অতঃপর শয়তান তাকে প্ররোচনা দিল, সে বললঃ হে আদম! আমি কি তোমাকে অনন্তকাল বেঁচে থাকার গাছের এবং এমন রাজত্বের সন্ধান দেব যা কখনো ক্ষয় হবে না? অতঃপর তারা উভয়েই তা থেকে আহার করল, তখন তাদের সামনে তাদের লজ্জাস্থান প্রকাশ পেয়ে গেল এবং তারা জান্নাতের পাতা দিয়ে নিজেদের আবৃত করতে লাগল। আর আদম তাঁর প্রতিপালকের অবাধ্য হলেন, ফলে তিনি পথভ্রান্ত হয়ে গেলেন।” [6]

 

এই আয়াতসমূহের ব্যাখ্যায় প্রসিদ্ধ মুফাসসির ইবন আশুর(র.) উল্লেখ করেছেন –

 

تَفْرِيعٌ عَلَى مَا قَبْلَهُ وَثَمَّ جُمْلَةٌ مَحْذُوفَةٌ دَلَّ عَلَيْهَا الْعَرْضُ، أَيْ فَعَمِلَ آدَمُ بِوَسْوَسَةِ الشَّيْطَانِ فَأَكَلَ مِنَ الشَّجَرَةِ وَأَكَلَتْ حَوَّاءُ مَعَهُ.

وَاقْتِصَارُ الشَّيْطَانِ عَلَى التَّسْوِيلِ لِآدَمَ وَهُوَ يُرِيدُ أَنْ يَأْكُلَ آدَمُ وَحَوَّاءُ، لِعِلْمِهِ بِأَنَّ اقْتِدَاءَ الْمَرْأَةِ بِزَوْجِهَا مَرْكُوزٌ فِي الْجِبِلَّةِ. وَتَقَدَّمَ مَعْنَى فَبَدَتْ لَهُما سَوْآتُهُما وَطَفِقا يَخْصِفانِ عَلَيْهِما مِنْ وَرَقِ الْجَنَّةِ فِي سُورَةِ الْأَعْرَافِ [٢٢] .

وَقَوْلُهُ وَعَصى آدَمُ رَبَّهُ عَطَفٌ عَلَى فَأَكَلا مِنْها، أَيْ أَكَلَا مَعًا، وَتَعَمَّدَ آدَمُ مُخَالَفَةَ نَهْيِ اللَّهِ تَعَالَى إِيَّاهُ عَنِ الْأَكْلِ مِنْ تِلْكَ الشَّجَرَةِ. وَإِثْبَاتُ الْعِصْيَانِ لِآدَمَ دُونَ زَوْجِهِ يَدُلُّ عَلَى أَنَّ آدَمَ كَانَ قُدْوَةً لِزَوْجِهِ فَلَمَّا أَكَلَ مِنَ الشَّجَرَةِ تَبِعَتْهُ زَوْجُهُ، وَفِي هَذَا الْمَعْنَى قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارا [التَّحْرِيم: ٦] .

অর্থঃ "এটি পূর্ববর্তী আলোচনারই একটি অংশ। এখানে একটি বাক্য উহ্য রয়েছে যা উপস্থাপিত প্রসঙ্গ দ্বারা প্রমাণিত হয়। অর্থাৎ, এরপর আদম শয়তানের প্ররোচনায় প্ররোচিত হয়ে কাজ করলেন এবং (নিষিদ্ধ) গাছ থেকে ফল আহার করলেন, আর হাওয়াও তাঁর সাথে আহার করলেন।

 

শয়তান আদম ও হাওয়া উভয়ের ফল আহার করার ইচ্ছা রাখা সত্ত্বেও, কেবল আদমকে প্ররোচিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এর কারণ হলো, সে জানত যে স্বামীর অনুকরণ করার বিষয়টি স্ত্রীর মানবীয় স্বভাব এবং মজ্জার গভীরে প্রোথিত (সহজাত বিষয়)। "অতঃপর তাদের উভয়ের সামনে তাদের লজ্জাস্থান প্রকাশ পেয়ে গেল এবং তারা জান্নাতের পাতা দিয়ে নিজেদের আবৃত করতে লাগল" - এই অংশের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ইতিপূর্বে সুরা আ'রাফের ২২ নম্বর আয়াতে অতিবাহিত হয়েছে।

 

আর আল্লাহর বাণীঃ "এবং আদম তাঁর প্রতিপালকের অবাধ্য হল" - এটি পূর্ববর্তী বাক্য "অতঃপর তাঁরা উভয়ে তা থেকে আহার করল" এর সাথে সংযোজিত হয়েছে। অর্থাৎ, তাঁরা উভয়ে একসাথে আহার করেছিলেন, কিন্তু আদম তাঁকে সেই গাছ থেকে আহার করতে আল্লাহ তাআলার দেওয়া নিষেধের ইচ্ছাকৃত লঙ্ঘন করেছিলেন। আর তাঁর স্ত্রীর পরিবর্তে কেবল আদমের দিকেই অবাধ্যতার সম্বন্ধ করা প্রমাণ করে যে, আদম তাঁর স্ত্রীর জন্য আদর্শ বা অনুসরণীয় ছিলেন। ফলে তিনি যখন গাছ থেকে ফল আহার করলেন, তখন তাঁর স্ত্রীও তাঁর অনুসরণ করলেন। এই অর্থেরই সমর্থনে আল্লাহ তাআলা (অন্যত্র) বলেছেনঃ "হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।" [সুরা তাহরিম ৬৬ : ৬]।" [7]

 

আমরা দেখলাম, কুরআনের বিবরণ বাইবেলের সম্পূর্ণ উল্টো! বাইবেলের তথ্য অনুযায়ী শয়তান ধোঁকা দিয়েছিল হাওয়া বা ইভকে, আর ইভ প্ররোচিত করে অ্যাডাম বা আদমকে (অর্থাৎ ইভ প্রকারান্তরে শয়তানের সহযোগী)। কিন্তু কুরআন অনুযায়ী শয়তান আদম(আ.)কে উদ্দেশ্য করে ধোঁকামূলক কথা বলে এবং সেই অবাধ্যতার ক্ষেত্রে আল্লাহ তা’আলা আদম(আ.)কেই সম্বোধন করেন। শয়তানের ধোকাঁ ছিল উভয়ের প্রতি, এককভাবে হাওয়া(আ.) এর প্রতি না। ইসলামবিরোধীরা এক্ষেত্রে বাইবেলের তথ্যের উপর ভিত্তি করে ইসলামকে দোষারোপ করে।

 

হাওয়া(আ.) কিভাবে স্বামীর খিয়ানত করেছিলেন?

হাওয়া (আ.) না হলে নারীরা স্বামীর খিয়ানত করত না” – এই সংক্রান্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় কোনো কোনো মুহাদ্দিস ইস্রাঈলিয়্যাহ থেকে অর্থাৎ বাইবেলে বর্ণিত কাহিনীর আলোকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, জান্নাতে হাওয়া(আ.)ই আদম(আ,)কে নিষিদ্ধ ফল খেতে উদ্বুদ্ধ করেছেন – আলোচ্য হাদিসে এই বিষয়টির ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁদের এই ব্যাখ্যা আল কুরআনে তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ প্রসঙ্গে কাতারভিত্তিক সুবিখ্যাত ফতোয়ার ওয়েবসাইট Islamweb এ প্রথমে এমন কিছু ব্যাখ্যা উল্লেখ করে এরপর বলা হয়েছে—

 

وَبِرَغْمِ أَنَّ مَا سَبَقَ هُوَ قَوْلُ أَكْثَرِ أَهْلِ الْعِلْمِ، إِلَّا أَنَّهُ لَا دَلِيلَ عَلَيْهِ مِنْ ظَاهِرِ الْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ، بَلْ ظَاهِرُ الْقُرْآنِ يَدُلُّ عَلَى أَنَّ آدَمَ وَحَوَّاءَ قَدْ أَكَلَا مِنَ الشَّجَرَةِ مَعاً، لَا أَنَّ حَوَّاءَ سَبَقَتْهُ إِلَى ذَلِكَ، أَوْ أَنَّهَا هِيَ الَّتِي زَيَّنَتْ لَهُ الْأَكْلَ مِنْهَا، وَأَنَّ ذَلِكَ كَانَ بِتَلْبِيسِ إِبْلِيسَ وَتَزْيِينِهِ وَوَسْوَسَتِهِ لَهُمَا جَمِيعاً، كَمَا قَالَ تَعَالَى: {وَيَا آدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ فَكُلَا مِنْ حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ * فَوَسْوَسَ لَهُمَا الشَّيْطَانُ لِيُبْدِيَ لَهُمَا مَا وُورِيَ عَنْهُمَا مِنْ سَوْآتِهِمَا وَقَالَ مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَنْ تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ * وَقَاسَمَهُمَا إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ * فَدَلَّاهُمَا بِغُرُورٍ فَلَمَّا ذَاقَا الشَّجَرَةَ بَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِفَانِ عَلَيْهِمَا مِنْ وَرَقِ الْجَنَّةِ وَنَادَاهُمَا رَبُّهُمَا أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَنْ تِلْكُمَا الشَّجَرَةِ وَأَقُلْ لَكُمَا إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمَا عَدُوٌّ مُبِينٌ} [الأعراف: 19ـ 22].بَلْ لَا يَبْعُدُ أَنْ يُقَالَ: إِنَّ ظَاهِرَ الْقُرْآنِ يَدُلُّ عَلَى الْعَكْسِ، وَهُوَ أَنَّ آدَمَ هُوَ السَّابِقُ إِلَى الْأَكْلِ، وَأَنَّ حَوَّاءَ اقْتَدَتْ بِهِ فِي ذَلِكَ، كَمَا فِي قَوْلِهِ تَعَالَى: {فَوَسْوَسَ إِلَيْهِ الشَّيْطَانُ قَالَ يَا آدَمُ هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْدِ وَمُلْكٍ لَا يَبْلَى * فَأَكَلَا مِنْهَا فَبَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِفَانِ عَلَيْهِمَا مِنْ وَرَقِ الْجَنَّةِ وَعَصَى آدَمُ رَبَّهُ فَغَوَى * ثُمَّ اجْتَبَاهُ رَبُّهُ فَتَابَ عَلَيْهِ وَهَدَى} [طه: 120 ـ122].

অর্থঃ "যদিও পূর্বে যা উল্লেখ করা হয়েছে তা অধিকাংশ আলেমের বক্তব্য, তবুও কুরআন ও সুন্নাহর জাহের বা প্রকাশ্য রূপ থেকে এর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেইবরং কুরআনের প্রকাশ্য রূপ এই নির্দেশ করে যে, আদম(আ.) ও হাওয়া(আ.) উভয়ে একসাথে গাছ থেকে ফল আহার করেছিলেন। এমনটি নয় যে, হাওয়া তাঁর আগে খেয়েছিলেন অথবা তিনি তাঁকে খাওয়ার জন্য প্ররোচিত করেছিলেন। বরং এটি ছিল ইবলিসের প্রতারণা, প্রলোভন ও কুমন্ত্রণার ফল যা সে তাদের উভয়ের মনে সৃষ্টি করেছিল। যেমনটি আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ "আর হে আদম! তুমি এবং তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো, অতঃপর তোমরা যেখান থেকে ইচ্ছা আহার করো, কিন্তু তোমরা এই গাছের নিকটবর্তী হয়ো না, তাহলে তোমরা জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে। অতঃপর শয়তান তাদের উভয়কে প্ররোচনা দিল, যাতে তাদের থেকে গোপন রাখা তাদের লজ্জাস্থান তাদের সামনে প্রকাশ করে দেয় এবং সে বললঃ তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের এই গাছ থেকে কেবল এজন্যই নিষেধ করেছেন যাতে তোমরা ফেরেশতা না হয়ে যাও কিংবা তোমরা চিরঞ্জীবদের অন্তর্ভুক্ত না হও। আর সে তাদের উভয়ের কাছে কসম খেয়ে বললঃ নিশ্চয়ই আমি তোমাদের উভয়ের জন্য শুভাকাঙ্ক্ষীদের একজন। অতঃপর সে তাদের উভয়কে প্রতারণার মাধ্যমে অধঃপতিত করল। এরপর যখন তারা উভয়ে সেই গাছের স্বাদ গ্রহণ করল, তখন তাদের সামনে তাদের লজ্জাস্থান প্রকাশ পেয়ে গেল এবং তারা জান্নাতের পাতা দিয়ে নিজেদের আবৃত করতে লাগল। আর তাদের প্রতিপালক তাদের ডেকে বললেনঃ আমি কি তোমাদের উভয়কে সেই গাছ থেকে নিষেধ করিনি এবং তোমাদের বলিনি যে, নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের উভয়ের প্রকাশ্য শত্রু?’ (সুরা আ'রাফ ৭ : ১৯-২২)।

 

বরং এটি বলা মোটেও অত্যুক্তি না যেঃ  কুরআনের প্রকাশ্য রূপ এর বিপরীত বিষয়ের দিকেই ইঙ্গিত করে। আর তা হলো - আদম(আ.)ই প্রথমে ফল আহার করেছিলেন এবং হাওয়া(আ.) এই ক্ষেত্রে তাঁর অনুকরণ করেছিলেন। যেমনটি আল্লাহ তা'আলার এই বাণীতে এসেছেঃ "'অতঃপর শয়তান তাকে প্ররোচনা দিল, সে বললঃ হে আদম! আমি কি তোমাকে অনন্তকাল বেঁচে থাকার গাছের এবং এমন রাজত্বের সন্ধান দেব যা কখনো ক্ষয় হবে না? অতঃপর তারা উভয়েই তা থেকে আহার করল, তখন তাদের সামনে তাদের লজ্জাস্থান প্রকাশ পেয়ে গেল এবং তারা জান্নাতের পাতা দিয়ে নিজেদের আবৃত করতে লাগল। আর আদম তাঁর প্রতিপালকের অবাধ্য হলেন, ফলে তিনি পথভ্রান্ত হয়ে গেলেন। এরপর তাঁর প্রতিপালক তাকে মনোনিত করলেন, অতঃপর তাঁর তাওবা কবুল করলেন এবং তাকে সৎপথে পরিচালিত করলেন।" (সূরা ত্বহা: ১২০-১২২)।" [8]

 

কাজেই আমরা এই হাদিসের জন্য মুহাদ্দিসদের সেই ব্যাখ্যাগুলো গ্রহণ করছি যেগুলো ইস্রাঈলিয়্যাহ নয় বরং কুরআনের অনুগামী। এবং যেগুলো কুরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।

আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবন হুবায়রা(র.) বলেছেন -

 

حَوَّاءُ فَقَدْ قِيلَ: إِنَّ خِيَانَتَهَا لِزَوْجِهَا، أَنَّهَا لَمَّا رَأَتْ آدَمَ قَدْ عَزَمَ عَلَى الْأَكْلِ مِنَ الشَّجَرَةِ تَرَكَتْ نُصْحَهُ فِي النَّهْيِ لَهُ؛ لِأَنَّ ذَلِكَ كَانَ تَرْكَ النُّصْحِ لَهُ خِيَانَةً؛ فَعَلَى هَذَا، كُلُّ مَنْ رَأَى أَخَاهُ الْمُؤْمِنَ عَلَى سَبِيلِ ذَلِكَ فَتَرَكَ نُصْحَهُ بِالنَّهْيِ عَنْ ذَلِكَ النَّهْيِ فَقَدْ خَانَهُ، وَلَا يَخْرُجُ هَذَا مِنْ تَسْمِيَةِ الْخَائِنِينَ الَّذِينَ جَزَمَ اللَّهُ سُبْحَانَهُ مِنْهُمْ: {إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْخَائِنِينَ} اللَّهُمَّ إِلَّا أَنْ يَسْكُتَ تَقِيَّةً، فَذَلِكَ لَهُ حُكْمٌ تَعَلَّقَ بِهِ.

অর্থঃ "হাওয়া(আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ তাঁর স্বামীর প্রতি তাঁর খিয়ানত ছিল মূলত এমন যে, তিনি যখন দেখলেন আদম(আ.) গাছ থেকে (ফল) খাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করেছেন, তখন তিনি তাঁকে নিষেধ করার ক্ষেত্রে সঠিক উপদেশ বা পরামর্শ দেওয়া বর্জন করেছিলেন। কারণ, সেই উপদেশ বর্জন করাটাই ছিল তাঁর (স্বামীর) প্রতি এক ধরণের খিয়ানত বা অবিশ্বস্ততা।

 

এই নিয়ম অনুযায়ী, যে ব্যক্তিই তার কোনো মুমিন ভাইকে এই ধরণের কোনো পথে (ভুল বা অন্যায়ের পথে) চলতে দেখবে এবং তাকে সেই পথ থেকে নিষেধ করার মাধ্যমে সঠিক উপদেশ দেওয়া বর্জন করবে, সে-ই তার সাথে খিয়ানত করল। আর এমন ব্যক্তি সেই 'খিয়ানতকারী'দের নাম ও গণ্ডি থেকে বের হতে পারবে না, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছেনঃ {নিশ্চয়ই আল্লাহ খিয়ানতকারীদের ভালোবাসেন না (সুরা আনফাল ৮ : ৫৮)}তবে হ্যাঁ, কেউ যদি কোনো ভয় বা আত্মরক্ষার কারণে চুপ থাকে, তাহলে তার বিধান ভিন্ন বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত হবে।" [9]

 

এ সংক্রান্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবনুল জাওযি(র.) উল্লেখ করেছেন,

 

وَأَمَّا خِيَانَةُ حَوَّاءَ زَوْجَهَا فَإِنَّهَا كَانَتْ فِي تَرْكِ النَّصِيحَةِ فِي أَمْرِ الشَّجَرَةِ لَا فِي غَيْرِ ذَٰلِكَ

অর্থঃ "আর হাওয়ার তাঁর স্বামীর প্রতি খিয়ানতের বিষয়টি ছিল গাছের (ফল খাওয়ার) ব্যাপারে সঠিক উপদেশ বা পরামর্শ না দেওয়ার মধ্যে, অন্য কোনো বিষয়ে নয়।" [10]

 

আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবনুল আসির(র.)ও অনুরূপ মত পোষণ করে বলেছেন –

 

خِيَانَةُ حَوَّاءَ آدَمَ: هِيَ تَرْكُ النَّصِيحَةِ لَهُ فِي أَمْرِ الشَّجَرَةِ، لَا فِي غَيْرِهَا.

অর্থঃ "আদমের(আ.) প্রতি হাওয়ার(আ.) খিয়ানত ছিল গাছের (ফল খাওয়ার) ব্যাপারে তাঁকে সঠিক উপদেশ বা পরামর্শ না দেওয়ার মধ্যে, অন্য কোনো বিষয়ে নয়।" [11]

 

দুনিয়ার নারীরা কি আদি মাতা হাওয়া(আ.) এর কাজের ভার বহন করে?

ইসলামী শরিয়তের প্রথম এবং সর্বপ্রধান উৎস আল কুরআন থেকে এই বিষয়টি স্পষ্ট যে – কোনো ব্যক্তি অন্য কারো পাপের ভার বহন করবে না। প্রত্যেক মানুষ নিজের বোঝা নিজেই বহন করবে, অন্যের বোঝা নয়। মানুষ নিজে যা করবে, শুধুমাত্র সেই কাজের ফল লাভ করবে। এটাই ইসলামী বিশ্বাস।

 

وَلَا تَكۡسِبُ كُلُّ نَـفۡسٍ اِلَّا عَلَيۡهَا​ۚ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزۡرَ اُخۡرٰى

অর্থঃ “প্রত্যেক ব্যক্তি যা অর্জন করে তার জন্য সে নিজেই দায়ী হবে। কোন ভারবহনকারীই অন্যের গুনাহের ভার বহন করবে না।[12]

 

مَنِ اهۡتَدٰى فَاِنَّمَا يَهۡتَدِىۡ لِنَفۡسِهٖ ​ۚ وَمَنۡ ضَلَّ فَاِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيۡهَا​ ؕ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزۡرَ اُخۡرٰى

অর্থঃ “যে হিদায়াত গ্রহণ করে, সে তো নিজের জন্যই হিদায়াত গ্রহণ করে এবং যে পথভ্রষ্ট হয় সে নিজের (স্বার্থের) বিরুদ্ধেই পথভ্রষ্ট হয়। আর কোন বহনকারী অপরের (পাপের) বোঝা বহন করবে না।[13] 

 

وَ لَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزۡرَ اُخۡرَىٰ ؕ وَاِنۡ تَدۡعُ مُثۡقَلَةٌ اِلٰى حِمۡلِهَا لَا يُحۡمَلۡ مِنۡهُ شَىۡءٌ وَّلَوۡ كَانَ ذَا قُرۡبٰى

অর্থঃ “কোন বহনকারী অন্যের (পাপের) বোঝা বইবে না। কেউ যদি তার গুরুভার বয়ে দেয়ার জন্য অন্যকে ডাকে তবে তার কিছুই বয়ে দেয়া হবে না- নিকটাত্মীয় হলেও।[14]

 

( 38 )   أَلَّا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ ( 39 )   وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ

অর্থঃ “ওটা এই যে, কোন বহনকারী অপরের বোঝা বহন করবেনা। আর এই যে, মানুষ তা’ই পায় যা সে করে।[15]

 

হাদিসে কেন বলা হল হাওয়া(আ.) না হলে নারীরা স্বামীর খিয়ানত করত না?

হাদিসে বলা হয়েছে হাওয়া(আ.) না হলে নারীরা স্বামীর খিয়ানত করত না। এটি তাহলে কী অর্থে বলা হয়েছে? জান্নাতে হাওয়া(আ.) যেভাবে আদম(আ.)কে সঠিক উপদেশ বা পরামর্শ না দিয়ে খিয়ানত করেছিলেন, সেই কাজের ভার কি দুনিয়ার সব নারী বহন করে? অথচ আমরা আল কুরআনের আলোকে এটিও দেখেছি কেউ অন্য কারো কাজের ভার বহন করে না। হাওয়া(আ.) ও নারীদের স্বামীর খিয়ানত সংক্রান্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবন হাজার আসকালানী(র.) বলেছেন -

 

وَلَمَّا كَانَتْ هِيَ أُمَّ بَنَاتِ آدَمَ أَشْبَهْنَهَا بِالْوِلَادَةِ وَنَزَعَ الْعِرْقَ فَلَا تَكَادُ امْرَأَةٌ تَسْلَمُ مِنْ خِيَانَةِ زَوْجِهَا بِالْفِعْلِ أَوْ بِالْقَوْلِ، وَلَيْسَ الْمُرَادُ بِالْخِيَانَةِ هُنَا ارْتِكَابَ الْفَوَاحِشِ، حَاشَا وَكَلَّا،

...

وَأَمَّا مَنْ جَاءَ بَعْدَهَا مِنَ النِّسَاءِ فَخِيَانَةُ كُلِّ وَاحِدَةٍ مِنْهُنَّ بِحَسَبِهَا. وَقَرِيبٌ مِنْ هَذَا حَدِيثُ جَحَدَ آدَمُ فَجَحَدَتْ ذُرِّيَّتُهُ.

وَفِي الْحَدِيثِ إِشَارَةٌ إِلَى تَسْلِيَةِ الرِّجَالِ فِيمَا يَقَعُ لَهُمْ مِنْ نِسَائِهِمْ بِمَا وَقَعَ مِنْ أُمِّهِنَّ الْكُبْرَى، وَأَنَّ ذَلِكَ مِنْ طَبْعِهِنَّ فَلَا يُفْرَطُ فِي لَوْمِ مَنْ وَقَعَ مِنْهَا شَيْءٌ مِنْ غَيْرِ قَصْدٍ إِلَيْهِ أَوْ عَلَى سَبِيلِ النُّدُورِ، وَيَنْبَغِي لَهُنَّ أَنْ لَا يَتَمَكَّنَّ بِهَذَا فِي الِاسْتِرْسَالِ فِي هَذَا النَّوْعِ بَلْ يَضْبِطْنَ أَنْفُسَهُنَّ وَيُجَاهِدْنَ هَوَاهُنَّ،.

অর্থঃ "যেহেতু তিনি [হাওয়া(আ.)] আদম-কন্যাদের মাতা, তাই তারা জন্মগতভাবে এবং বংশগত বৈশিষ্ট্যের কারণে তাঁর সাদৃশ্য লাভ করেছে। ফলে খুব কম মহিলাই আছেন যারা কাজে কিংবা কথায় স্বামীর প্রতি খিয়ানত (অবিশ্বস্ততা) করা থেকে মুক্ত থাকতে পারেন। তবে এখানে 'খিয়ানত' বলতে কোনো প্রকার অশ্লীলতা বা ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া বোঝানো হয়নি, কখনোই না, একেবারেই না!

...

আর তাঁর পরে যেসব নারী এসেছেন, তাদের প্রত্যেকের খিয়ানত বা অবিশ্বস্ততা হচ্ছে তাদের নিজস্ব পরিস্থিতি ও পর্যায় অনুযায়ী। এই বিষয়টির কাছাকাছি হলো সেই হাদিসঃ "আদম অস্বীকার করলেন, ফলে তাঁর বংশধরেরাও অস্বীকার করে। (তিরমিযি ৩০৭৬)"

হাদিসটিতে পুরুষদের প্রতি সান্ত্বনা রয়েছে যে, তাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে যা কিছু [ভুল-ভ্রান্তি বা খিয়ানত] ঘটে থাকে, তা তাদের আদি মাতার পক্ষ থেকেও ঘটেছিল এবং এটি তাদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য সুতরাং অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বা কদাচিৎ কোনো ভুল হয়ে গেলে সেই নারীকে তিরস্কার করার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। আর নারীদেরও উচিত নয় একে অজুহাত বানিয়ে এই ধরণের আচরণে লিপ্ত থাকা বরং তাদের উচিত নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করা এবং নফসের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। " [16]

 

অর্থাৎ এই হাদিসের উদ্দেশ্য মোটেও এটি না যে হাওয়া(আ.) এর কাজের ভার সকল নারী বহন করে বা সেই কাজের জন্য নারীরা পাপী। বরং এই হাদিসের উদ্দেশ্য হল আদি মাতা হিসেবে হাওয়া(আ.) এর কিছু বৈশিষ্ট্য তাঁর বংশধর নারীজাতির মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে, এই বিষয়টি উল্লেখ করা। এ জন্য নারীরা দোষী হবে না কারণ এটা তাদের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য। এই হাদিসের আরো একটি শিক্ষা হল নারীরা কোনো ভুল করলেই তাদেরকে সে জন্য ভৎর্সনা না করে সহনশীল আচরণ করা। একই রকম হাদিস আদম(আ.) প্রসঙ্গেও রয়েছে যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে আদম(আ.) এর বৈশিষ্ট্য তাঁর বংশধরেরা বহন করে।

আলোচ্য হাদিস প্রসঙ্গে ড. মুহাম্মাদ বিন ফারিদ যারইউহ (হাফি.) উল্লেখ করেছেন—

 

تَبْقَى دَعْوَى الْمُعَارَضَةِ الثَّانِيَةِ فِي تَوْرِيثِ الشَّرِّ وَالذَّنْبِ لِبَنَاتِ حَوَّاءَ، كَمَا يَزْعُمُهُ الْمُعْتَرِضُ مُرَادًا لِلْحَدِيثِ، فَيُقَالُ فِي نَفْيِهَا:

كَلَّا، لَيْسَ هَذَا مُرَادًا مِنْ هَذَا الْحَدِيثِ الشَّرِيفِ! حَاشَاهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ نِسْبَةِ الظُّلْمِ إِلَى الْفِعْلِ الْإِلَهِيِّ، فَقَدْ تَقَرَّرَ آنِفًا أَنَّ خِيَانَةَ حَوَّاءَ هِيَ مِنْ نَوْعِ تَرْكِ النَّصِيحَةِ لِآدَمَ، أَوْ مِنْ نَوْعِ زِيَادَةِ تَزْيِينِ الْمَنْهِيِّ لَهُ.

مِثْلُ هَذَا السُّلُوكِ الَّذِي كَانَ مِنْ حَوَّاءَ -بِمَفْهُومِهِ الْعَامِّ- خِصْلَةٌ مُطَّرِدَةٌ فِي نُفُوسِ النِّسَاءِ فِي الْجُمْلَةِ، وَ «خِيَانَةُ كُلِّ وَاحِدَةٍ مِنْهُنَّ بِحَسَبِهَا» (١)، وَلَيْسَ فِي الْحَدِيثِ مَا يُفِيدُ لُزُومَ أَنْ يَشْمَلَهُنَّ هَذَا الطَّبْعُ جَمِيعَهُنَّ.

فَعَلَى هَذَا، يَكُونُ مُرَادُ الْحَدِيثِ مُجَرَّدَ الْبَيَانِ عَنِ اطِّرَادِ الْحَالِ، وَانْتِقَالِ الْقَابِلِيَّةِ لِلشَّيْءِ مِنَ الْأَصْلِ إِلَى فُرُوعِهِ.

وَفِي تَقْرِيرِ هَذَا الْمَعْنَى مَقْصِدًا لِلْحَدِيثِ، يَقُولُ مُحَمَّدُ بَهْجَتُ الْبَيْطَارُ (ت ١٣٩٦ هـ) فِي شَرْحِهِ:

«إِنَّ طَبِيعَةَ النِّسَاءِ وَاحِدَةٌ، وَاسْتِعْدَادُهُنَّ وَاحِدٌ فِي الْخِلْقَةِ وَالْقَابِلِيَّةِ، لَا فَرْقَ بَيْنَ حَوَّاءَ وَغَيْرِهَا مِنَ اللَّائِي جِئْنَ بَعْدَهَا، وَقَدْ خُلِقَتْ حَوَّاءُ -وَهِيَ أُمُّ النِّسَاءِ- قَابِلَةً لِلْخِيَانَةِ وَالْخَطَأِ، فَخُلِقَتْ بَنَاتُهَا مِثْلَهَا فِي ذَلِكَ الِاسْتِعْدَادِ وَالْقَبُولِ، وَفِي تِلْكَ الْخِلْقَةِ وَالصِّبْغَةِ، لَا تَتَفَاوَتُ بَيْنَ أَفْرَادِ النِّسَاءِ فِي ذَلِكَ.

وَلَوْ أَنَّ حَوَّاءَ خُلِقَتْ غَيْرَ قَابِلَةٍ لِذَلِكَ: لَمَا وَقَعَ مِنْهَا شَيْءٌ مِمَّا ذَكَرْنَا، لِأَنَّهَا غَيْرُ قَابِلَةٍ لَهُ، كَمَا خُلِقَتِ الْمَلَائِكَةُ غَيْرَ قَابِلَةٍ لِلْعِصْيَانِ، وَلَكَانَتْ بَنَاتُهَا غَيْرَ قَابِلَاتٍ وَلَا مُسْتَعِدَّاتٍ لِشَيْءٍ مِنْهُ! فَلَمْ يَقَعْ مِنْهُنَّ شَيْءٌ، لِأَنَّ الطَّبِيعَةَ وَاحِدَةٌ».

অর্থঃহাওয়া(আ.) এর কন্যাদের মাঝে মন্দ ও পাপের উত্তরাধিকার সঞ্চারিত হওয়ার ব্যাপারে দ্বিতীয় যে আপত্তির দাবিটি রয়ে যায়, যেমনটি অভিযোগকারী এই হাদিসের উদ্দেশ্য বলে দাবি করেন, তার খণ্ডনে বলা হবেঃ কখনোই নয়, এই হাদিসের উদ্দেশ্য এটি নয়! আল্লাহর কর্মের প্রতি জুলুমের দায় চাপানো থেকে রাসুলুল্লাহ() অনেক ঊর্ধ্বে। ইতিপূর্বেই সাব্যস্ত হয়েছে যে, হাওয়া(আ.) এর খিয়ানত ছিল আদম(আ.)কে সদুপদেশ প্রদান না করা অথবা তাঁর নিকট নিষিদ্ধ বিষয়টিকে অধিকতর শোভনীয় করে উপস্থাপন করার মতো বিষয়। হাওয়া(আ.) এর পক্ষ থেকে প্রকাশিত এই ধরনের আচরণ তার সাধারণ অর্থ অনুযায়ী সামগ্রিকভাবে নারীদের স্বভাবজাত একটি বৈশিষ্ট্য এবং “তাদের প্রত্যেকের খিয়ানত তার নিজ নিজ অবস্থান অনুযায়ী হয়ে থাকে।” [ফাতহুল বারী ৬/৩৬৮] এই হাদিসে এমন কিছু নেই যা দ্বারা এই স্বভাবটি সকল নারীর অন্তর্ভুক্ত হওয়া আবশ্যক বলে প্রমাণিত হয়। সুতরাং, এই দৃষ্টিকোণ থেকে এ হাদিসের উদ্দেশ্য হলো কেবলই একটি বাস্তব অবস্থার ধারাবাহিকতা প্রকাশ করা এবং মূল বা উৎস থেকে শাখা-প্রশাখায় কোনো বিষয়ের যোগ্যতা বা প্রবণতার স্থানান্তর ঘটা।

 

হাদিসের উদ্দেশ্য হিসেবে এই অর্থটি সাব্যস্ত করতে গিয়ে মুহাম্মাদ বাহজাত আল বাইতার (মৃত্যুঃ ১৩৯৬ হিজরি) তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেনঃ “নিশ্চয়ই নারীদের প্রকৃতি অভিন্ন এবং সৃষ্টি ও প্রবণতার ক্ষেত্রে তাদের যোগ্যতা একই রকম। হাওয়া(আ.) এবং তাঁর পরে আগত অন্য নারীদের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। নারীদের আদিমাতা হাওয়া(আ.)কে খিয়ানত ও ভুল করার প্রবণতা দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছে। ফলে তাঁর কন্যারাও সেই প্রবণতা ও গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে তাঁর মতোই সৃজিত হয়েছে। তাদের সৃষ্টি ও গঠনের ক্ষেত্রে নারীদের ব্যক্তিবর্গের মাঝে কোনো তারতম্য নেই। যদি হাওয়া(আ.)কে এই প্রবণতা ছাড়াই সৃষ্টি করা হতো, তবে আমরা যা উল্লেখ করেছি তার কিছুই তাঁর থেকে প্রকাশ পেত না। কারণ তিনি তখন এর যোগ্যই হতেন না, যেমন ফেরেশতাদের অবাধ্যতার প্রবণতাহীন করে সৃষ্টি করা হয়েছে। [হাওয়া(আ.) তেমন হলে] তাঁর কন্যারাও এই ধরনের কোনো বিষয়ের যোগ্যতা বা প্রবণতা রাখত না! ফলে তাদের থেকেও এমন কিছু ঘটত না। কারণ সবার প্রকৃতি তো একটাই।[17]

 

অর্থাৎ এর এই বৈশিষ্ট্য বা প্রবনতা থাকার ফলে সকল নারীই যে স্বামীর খিয়ানত করবে বিষয়টা এমনও নয়। প্রত্যেককে তার নিজ পরিস্থিতি অনুযায়ী বিচার করা হবে।


ইসলামে নারীরা কি সকল দুর্দশার মূলঃ

দ্বীন ইসলামে বলা হয়েছেঃ মায়ের পায়ের নিচে জান্নাত।

 

عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ جَاهِمَةَ السَّلَمِيِّ أَنَّ جَاهِمَةَ جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ أَرَدْتُ أَنْ أَغْزُوَ وَقَدْ جِئْتُ أَسْتَشِيرُكَ فَقَالَ هَلْ لَكَ مِنْ أُمٍّ قَالَ نَعَمْ قَالَ فَالْزَمْهَا فَإِنَّ الْجَنَّةَ تَحْتَ رِجْلَيْهَا

অর্থঃ মুআবিয়া বিন জাহেমাহ সুলামী বলেন, একদা জাহেমাহ (রা.) নবী()-এর নিকট এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রসূল! আমি জিহাদ করব মনস্থ করেছি, তাই আপনার নিকট পরামর্শ নিতে এসেছি।এ কথা শুনে তিনি বললেন, তোমার মা আছে কি? জাহেমাহ (রা.) বললেন, ‘হ্যাঁতিনি বললেন, তাহলে তুমি তার খিদমতে অবিচল থাক। কারণ, তার পদতলে তোমার জান্নাত রয়েছে। [18]

 

ইসলামে নারী জাতি যদি সত্যিইই সকল দুর্দশার মূল হতো – তাহলে কী করে মায়ের পায়ের নিচে জান্নাত হয়? দুর্দশার মূল কারো পায়ের নিচে কি জান্নাত হতে পারে? যার পায়ের নিচে জান্নাত, তার থেকে মহান মর্যাদা আর কার হতে পারে?

 

যে আরবে একসময় কন্যা সন্তানদেরকে অশুভ ও লজ্জার বিষয় মনে করে জীবন্ত কবর দেয়া হতো – ইসলাম তা চিরতরে বন্ধ করেছে।

 

“... ...আর তিনি [নবী()] মায়েদের অবাধ্য হতে, কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দিতে প্রাপকের পাওনা দেয়া থেকে হাত গুটাতে আর নেয়ার ব্যাপারে হাত বাড়িয়ে দিতে নিষেধ করতেন। আবূআবদুল্লাহ্ [বুখারী (র.)] বলেন, তারা (কাফির) জাহিলীয়্যাতের যুগে স্বীয় কন্যাদেরকে হত্যা করতেন। অতঃপর আল্লাহ তা হারাম করে দেন। [19]

 

ইসলাম শুধু জীবন্ত কন্যা সন্তান কবর দেয়া বন্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি, কন্যা সন্তানকে উত্তমভাবে প্রতিপালন করবার আদেশ দিয়েছে এবং একে তার পিতামাতার জান্নাতে যাবার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে! এমনকি ভাইয়ের জন্য বোনের সাথে মমতাপূর্ণ আচরণ করাকেও জান্নাতে যাবার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কন্যা সন্তান উত্তমভাবে প্রতিপালন সম্পর্কে অনেক সাহাবী থেকে বহু সংখ্যক হাদিস বর্ণিত রয়েছে যার সবগুলো উল্লেখ করলে আমাদের প্রবন্ধের কলেবর বিশাল হয়ে যেতে পারে। আমরা উদাহরণ হিসেবে ইমাম বুখারী(র.) এর আদাবুল মুফরাদ গ্রন্থ থেকে ৭৬ থেকে ৭৯ নং হাদিস উল্লেখ করছি। এর প্রতিটি হাদিসই সহীহ। –

 

উকবা ইবনে আমার (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ() -কে বলতে শুনেছিঃ যার তিনটি কন্যা সন্তান আছে এবং সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করে এবং তাদেরকে যথাসাধ্য উত্তম পোশাকাদি দেয়, তারা তার জন্য দোযখ থেকে রক্ষাকারী প্রতিবন্ধক হবে (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)।

 

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী ()  বলেন, যে মুসলিমের দুইটি কন্যা সন্তান আছে এবং সে তাদেরকে উত্তম সাহচর্য দান করে তারা তাকে বেহেশতে দাখিল করবে (ইবনে মাজাহ, হাকিম)।

 

জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ() বলেছেনঃ যার তিনটি কন্যা সন্তান আছে এবং সে তাদেরকে আশ্রয় দিয়ে তাদের ব্যয়ভার বহন করে এবং তাদের সাথে দয়ার্দ্র ব্যবহার করে, তার জন্য বেহেশত অবধারিত হয়ে যায়। লোকজনের মধ্য থেকে একজন বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কারো যদি দুটি কন্যা সন্তান থাকে? তিনি বলেনঃ দুইটি কন্যা সন্তান হলেও (আবু দাউদ, তাবারানী, বাযযার)।

 

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ() বলেনঃ যে ব্যক্তির তিনটি কন্যা সন্তান বা তিনটি বোন আছে এবং সে তাদের সাথে মমতাপূর্ণ ব্যবহার করে, সে বেহেশতে প্রবেশ করবে (দারিমী, তিরমিযী, আবু দাউদ, হিব্বান)। [20]

 

নারীরা যদি দুর্দশার মূলই হতো, তাহলে কি তাদেরকে জান্নাতে যাবার কারণ বলা হতো? ইসলামে নারীকে যদি অশুভ জীব হিসেবেই গণ্য করা হতো, তাহলে কি কন্যাসন্তানকে এভাবে উত্তমভাবে প্রতিপালনের আদেশ দেয়া হতো? জান্নাতে যাবার কারণের চেয়ে মঙ্গলজনক আর কিছু কি হতে পারে? প্রিয় পাঠক, লক্ষ করুন। যে ইসলাম জাহিলী আরবের বর্বর রীতিনীতিকে উৎখাত করে কন্যাসন্তানের প্রতি সদাচরণের আদেশ দিয়েছে এবং একে জান্নাতে যাবার কারণ বানিয়েছে, নাস্তিক-মুক্তমনারা সেই ইসলামকেই নারীবিদ্বেষী এক ধর্ম হিসেবে উপস্থাপনের অপচেষ্টা করছে

 

ইসলাম মুমিন পুরুষদেরকে আদেশ করেছে মুমিন নারীর প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ না রাখতে। তাকে অশুভ বা অপয়া মনে করে ঘৃণিত বানিয়ে রাখবার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই।

 

 قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ»

অর্থঃ রাসুলুল্লাহ() বলেছেনঃ কোনো মুমিন যেন মুমিনাহ্-কে ঘৃণা না করে (বা তার প্রতি শত্রুতা পোষণ না করে); যদি তার কোনো আচরণে সে অসন্তোষ প্রকাশ করে, তবে অন্য আর এক আচার-ব্যবহারে সন্তুষ্টি লাভ করবে। [21]

 

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় [22]  বলা হয়েছে,

 

নবী() -এর বাণী : (لَا يَفْرَكْ) শেষ অক্ষর সাকীন বা জযম কিংবা পেশ উভয় যোগ পাঠ সিদ্ধ। (ر) বর্ণটি যবর যোগে পঠিত হয়; আভিধানিক অর্থ মর্দন করা, দলিত করা। মুল্লা আলী কারী(রহঃ) বলেনঃ (فَرْكٌ) শব্দটি بُعْضٌ এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ ঘৃণা, অবজ্ঞা, অপছন্দ ইত্যাদি। হাদীসের অর্থ দাঁড়ায়, কোনো মুমিন পুরুষ কোনো মুমিনাহ্ নারীকে অর্থাৎ স্বামী তার স্ত্রীকে ঘৃণা করবে না। কোনো বিষয়েই ঘৃণা বা অবজ্ঞা করবে না, কারণ তার মধ্যে অন্য যে গুণটি রয়েছে তাতে সে খুশি হবে। একজন মানুষ হিসেবে সকল গুণ তার মধ্যে থাকতে পারে না।

 

কাযীইয়ায বলেনঃ (لَا يَفْرَكْ) এটা নাফী বা না-বাচক কর্ম কিন্তু অর্থ প্রদান করেছে নাহী বা নিষেধাজ্ঞাবাচক কর্মের। এর অর্থ হয়েছে স্ত্রীর অপছন্দনীয় কিছু দেখে তাকে অবজ্ঞা অথবা ঘৃণা করা কোনো পুরুষের জন্য উচিত নয়। কেননা একটি বিষয় সে অপছন্দ করছে অন্যটি সে অবশ্যই পছন্দ করবে এবং তাতে খুশি হবে। এই ভালো গুণটি দিয়ে সে খারাপটির মোকাবেলা করবে। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, দোষ ছাড়া কোনো মানুষই পাওয়া যায় না, কেউ যদি দোষ ছাড়া কোনো মানুষ খুঁজতে যায় তাহলে সে সাথীহীন একাই পড়ে থাকবে।

 

এতে আরো ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, সকল মানুষই বিশেষ করে মুমিনের মধ্যে কতিপয় উত্তম ও প্রশংসিত স্বভাব বা গুণাবলী রয়েছে, এই উত্তম আচরণ ও গুণাবলীকে বিবেচনায় আনবে আর অন্য খারাপ স্বভাবগুলো ঢেকে রাখবে এবং এড়িয়ে চলবে।[23]

 

দুর্দশার মূল বলে গণ্য করা তো দূরের কথা ইসলামে একজন সচ্চরিত্রবান নারীকে পৃথিবীর সর্বোত্তম সম্পদ বলা হয়েছে।

 

“‘সম্পূর্ণ পৃথিবী সম্পদ। আর পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তম সম্পদ হচ্ছে সৎ চরিত্রবান নারী [24]

 

আরো পড়ুনঃ 

বনী ইস্রাঈলের পাপের পর থেকে কি খাদ্যে বা মাংসে পচন ধরা শুরু হয়?

 

নন্দন-কাননে নগ্নতা

 

 

তথ্যসূত্রঃ


[1] সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ৩০৯৫

https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=3353

[2] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং : ৩৫৪৩

https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=50626

[3] বাইবেল, আদিপুস্তক (Genesis) : ১-৬, ১১-১২, ১৬

https://www.bible.com/bible/3150/GEN.3.BERV

[4] আল কুরআন, লুকমান ৩১ : ১৪

[5] দেখুনঃ তাফসীরে আহসানুল বায়ানতাফসীরে জাকারিয়া , সুরা লুকমানের ১৪ নং আয়াতের তাফসির

https://www.hadithbd.com/quran/link/?id=3483

[6] আল কুরআন, ত্ব-হা ২০ : ১২১

[7] তাফসির ইবন আশুর (আত তাহরির ওয়াত তানওয়ির) – তাহির বিন আশুর, খণ্ড ১৬, পৃষ্ঠা ৩২৬-৩২৭, সুরা ত্ব-হা'র ১২১-১২২ নং আয়াতের তাফসির

https://shamela.ws/book/9776/5811

https://shamela.ws/book/9776/5812

অথবা (আর্কাইভকৃত)

https://archive.is/wip/LAmNa

https://archive.is/wip/p7GqA

[8] التَّأْوِيلُ الصَّحِيحُ لِحَدِيثِ: لَوْلَا حَوَّاءُ لَمْ تَخُنْ أُنْثَىٰ زَوْجَهَا (Islamweb)

https://www.islamweb.net/ar/fatwa/357385/

অথবা https://archive.is/wip/8fXra (আর্কাইভকৃত)

[9] আল ইফসাহু 'আন মা'আনিস সিহাহ - ইবন হুবায়রা, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ২৩০

https://shamela.ws/book/13572/2146

অথবা https://archive.is/wip/Og8Xg (আর্কাইভকৃত)

[10] কাশফুল মুশকিলি মিন হাদিসিস সহীহাইন - ইবনুল জাওযি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৫০৪

https://shamela.ws/book/5906/1598

অথবা https://archive.is/wip/h47po (আর্কাইভকৃত)

[11] জামিউল উসুল - ইবনুল আসির, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ৩২৫

https://shamela.ws/book/25800/8055

অথবা https://archive.is/wip/YHK4c (আর্কাইভকৃত)

[12] আল কুরআন, আন’আম ৬ : ১৬৪

[13] আল কুরআন, বনী ইস্রাঈল ১৭ : ১৫

[14] আল কুরআন, ফাতির ৩৫ : ১৮

[15] আল কুরআন, নাজম ৫৩ : ৩৮-৩৯

[16] ফাতহুল বারী - ইবন হাজার আসকালানী, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৬৮

https://shamela.ws/book/1673/3562

অথবা https://archive.is/wip/R83VG (আর্কাইভকৃত)

[17] আল মুআ'রাদ্বাতুল ফিকরিইয়াতুল মুআ'সিরাতু লি আহাদিছিস সহিহাইন - মুহাম্মাদ বিন ফারিদ যারইউহ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৬৪৬

https://shamela.ws/book/224/1514

অথবা https://archive.is/wip/HiYQx (আর্কাইভকৃত)

[18] আহমাদ ১৫৫৩৮, নাসাঈ ৩১০৪, ইবনে মাজাহ ২৭৮১, বাইহাক্বী ১৮২৮৮, হাকেম ২৫০২ (সহীহ)

https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=65463

[19] সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ৭২৯২

https://www.hadithbd.com/hadith/error/?id=32137

[20] আল আদাবুল মুফরাদ ইমাম বুখারী

https://www.hadithbd.com/hadith/detail/?book=20&section=486

[21] সহীহ : মুসলিম ১৪৬৯, আহমাদ ৮৩৬৩, সহীহ আত্ তারগীব ১৯২৮, সহীহ আল জামি ৭৭৪১।

https://www.hadithbd.net/hadith/link/?id=68565

[22] হাদিসের ব্যাখ্যার উৎসঃ তাহকিক মিশকাতুল মাসাবিহ (হাদিস একাডেমি), ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০১

[23] শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৬৯; মুসনাদ আহমাদ ২য় খন্ড, ৩২৯ পৃঃ; মিরকাতুল মাফাতীহ

[24] বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩০৮৩; সুত্রঃ উপদেশ আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ পৃষ্ঠা ১৪৭

 

 

সোশ্যাল লিঙ্ক ও অ্যাপ

সর্বাধিক পঠিত

সর্বশেষ পোস্টসমূহ