কুরআনের বর্ণনাকারী ইমাম হাফস কি দুর্বল রাবী ও মিথ্যাবাদী ছিলেন?

কুরআনের বর্ণনাকারী ইমাম হাফস কি দুর্বল রাবী ও মিথ্যাবাদী ছিলেন?

59 বার দেখা হয়েছে
শেয়ার করুন:

 

মূলঃ ইসলাম কিউএ

অনুবাদঃ মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনার

 

অনুবাদকের ভূমিকাঃ ইসলামের শত্রুরা দ্বীন ইসলামকে ভিত্তিহীন প্রমাণের জন্য বিভিন্ন উপায়ে ইসলামী শরিয়তের ১ নং উৎস আল কুরআনকে আক্রমণ করে। তারা প্রচার করে – মুসলিমদের দাবিমতে আল কুরআনের বিভিন্ন ক্বিরাতের অধীনে যেসব রেওয়ায়েত আছে, এর সবগুলোই সহীহ ও মুতাওয়াতিরভাবে বর্ণিত। অথচ প্রায় ৯৫% মুসলিম একমাত্র যে রেওয়ায়েতটি পড়ে অর্থাৎ হাফস রেওয়ায়েতের কুরআন অত্যন্ত যঈফ বা দুর্বল সনদে বর্ণিত আছে! এর কারণ হল, রিজাল শাস্ত্রের ইমামদের মতে আসিমের ক্বিরাতের বর্ণনাকারী হাফস একজন অত্যন্ত দুর্বল হাদিস বর্ণনাকারী। এমনকি রিজালশাস্ত্রে হাফসকে মিথ্যাবাদী পর্যন্ত বলা হয়েছে! মুসলিমরা একজন মিথ্যাবাদী রাবীর বর্ণিত কুরআন পাঠ করে দাবি যে এই কুরআন সহীহ ও মুতাওয়াতির!

- ইসলামবিরোধীদের এহেন প্রচারণার বিস্তারিত জবাবে এই প্রবন্ধটি।

 

ফতোয়া নং ৩৪০৩৩৬: ইবন খিরাশ কর্তৃক ক্বারী হাফস বিন সুলাইমানের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার বা হাদিস জাল করার অভিযোগ প্রসঙ্গে

 

প্রশ্নঃ

অনেকে প্রশ্ন করেন যে, আপনারা কুরআন পাঠে আবু উমার হাফস বিন সুলাইমান আল আসাদী আল কুফী আল ক্বারীর বর্ণনার ওপর কিভাবে আস্থা রাখেন, যেখানে ইবন খিরাশ তাকে মিথ্যাবাদী বলেছেন এবং দাবি করেছেন যে তিনি হাদিস জাল করতেন? যদি তিনি হাদিস জালকারী হয়ে থাকেন, তবে কুরআনের বর্ণনার ক্ষেত্রে আমরা তাকে কিভাবে বিশ্বাস করতে পারি?

আমি ড. আবদুল্লাহ আশ-শাহরী’র (আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান দিন) একটি গবেষণাকর্ম পড়েছি, যেখানে তিনি ক্বারী হাফস সম্পর্কে ইয়াহইয়া ইবন মাঈনের (আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন) দুর্বল বলার ও তাকে মিথ্যাবাদী হিসেবে অভিহিত করার বিষয়ে যথেষ্ট উত্তর দিয়েছেন। কিন্তু সেখানে ইবন খিরাশের সেই মন্তব্যের [যে হাফস হাদিস জাল করতেন] কোনো পর্যাপ্ত খণ্ডন খুঁজে পাইনি। উল্টো সেখানে ইবন খিরাশকে সমর্থন করা হয়েছে! ড. শাহরী অত্যন্ত ইলমী পন্থায় সেই বর্ণনাগুলোকে দুর্বল প্রমাণ করেছেন যেগুলোতে বলা হয়েছিল যে ইবন খিরাশ দুই শায়খের [আবু বকর(রা.) ও উমার(রা.)] সমালোচনায় দু’টি বই লিখেছিলেন। তিনি ইবন খিরাশকে ‘রাফিযি’ (কট্টর শিয়া) বলার দাবিটিও প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বলেছেন যে, তার পক্ষে রাফিযি হওয়া অসম্ভব, কারণ তিনি হাদিস নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন, অথচ ইবন খিরাশের সময় রাফিযিদের মধ্যে কোনো হাদিস বিশারদ ছিল না। ঐ গবেষণা কর্মের শিরোনাম ছিলঃ হাফস বিন সুলাইমান আল মুক্বরী ও তাঁর বর্ণনাসমূহঃ গ্রহণ ও বর্জনের মাঝে - প্রফেসর ড. গানিম ক্বাদুরী আল হামাদের সাথে একটি ইলমী আলোচনা।

তাহলে কি আমরা ইবন খিরাশের বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করবো এই কারণে যে তিনি একাই হাফসকে মিথ্যাবাদী ও হাদিস জালকারী হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন? কেউ কেউ বলেন ইবন খিরাশ একজন রাফিযি ছিলেন, আবার কেউ কেউ এর উল্টোটা বলেন। আর এই জবাবগুলো পরস্পরবিরোধী। আমি জানি না কোন কথাটি সঠিক। যদি এমন কোনো বই থাকে যেখানে এই সংশয়ের জবাব বিস্তারিতভাবে দেওয়া আছে, তাহলে অনুগ্রহ করে এর নাম লিখে জানাবেন।

 

উত্তরের সারসংক্ষেপঃ
ইমাম হাফস বিন সুলাইমান আল ক্বারী কুরআন পাঠের (ক্বিরাত) ক্ষেত্রে একজন অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও সুপ্রতিষ্ঠিত ইমাম। তবে হাদিস শাস্ত্রের ক্ষেত্রে তিনি 'মাতরুক' (পরিত্যক্ত), অর্থাৎ তাঁর বর্ণিত হাদিস গ্রহণ করা হয় না। আর তাঁর বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলার যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা ইতিপূর্বে [এই প্রবন্ধের মাঝে আলোচিত হবে] যেমন আলোকপাত করা হয়েছে - সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

একজন আলিম জ্ঞানের কোনো একটি নির্দিষ্ট শাখায় অত্যন্ত দক্ষ ও শক্তিশালী হতে পারেন, যা তিনি নিখুঁতভাবে আয়ত্ত্ব করেন এবং সেই বিষয়ে তার কথা গ্রহণযোগ্য হয়। আবার সেই একই ব্যক্তি অন্য কোনো বিদ্যায় দক্ষ নাও হতে পারেন এবং সেখানে তার ভুলভ্রান্তি বেশি হওয়ার কারণে ঐ বিষয়ে তার বক্তব্য গ্রহণ করা হয় না।

 

উত্তরঃ


সূচিপত্রঃ

১. কুরআন পাঠে (ক্বিরাত) ইমাম হাফসের মর্যাদা এবং হাদিস বর্ণনায় তাঁর অবস্থান।
২. হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে ইমাম হাফসের বিরুদ্ধে আনীত মিথ্যা বলার অভিযোগের খণ্ডন।

 

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য এবং দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসুলের উপর।

অতঃপর -

 

প্রথমতঃ কুরআন পাঠে (ক্বিরাত) ইমাম হাফসের মর্যাদা এবং হাদিস বর্ণনায় তাঁর অবস্থান

হাফস বিন সুলাইমান আল আসাদী আল ক্বারী(র.) কুরআন পাঠের ক্ষেত্রে একজন সুপ্রতিষ্ঠিত ইমাম এ বিষয়ে সকল আলিম একমত।

তবে হাদিস ও এর বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি ‘মাতরুকুল হাদিস’ (পরিত্যক্ত), কারণ হাদিস চর্চা তাঁর মূল কাজ ছিল না এবং তিনি এ বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেননি।

 

তাঁর হাদিস ‘মাতরুক’ হওয়ার বিষয়টি বহু নির্ভরযোগ্য মুহাক্কিক আলিম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেনঃ

  • ইমাম বুখারী(র.) তাঁরআদ দু’আফাউস সগির (৭৩) গ্রন্থে বলেছেনঃ “তাঁরা (মুহাদ্দিসগণ) তাঁকে বর্জন করেছেন।
  • ইমাম আহমাদ(র.) {তাঁর একটি বর্ণনায়যেমন ‘আল ইলাল’ ২৬৯৮-এ এসেছে}আবু হাতিম(র.) {‘আল জারহ ওয়াত তা‘দিল’ ৩/১৭৩}মুসলিম(র.) {‘আল কুনা’ ২১৬৪}এবং নাসাঈ(র.) {‘আদ দু‘আফা ওয়াল-মাতরুকিন’ ১৩৪} বলেছেনঃ “তিনি মাতরুকুল হাদিস (পরিত্যক্ত হাদিস বর্ণনাকারী)।” অবশ্য ইমাম আহমাদ(র.) থেকে অন্য একটি বর্ণনা আছে যেখানে তিনি হাফস সম্পর্কে একবার বলেছেনঃ “তিনি নেককার (সালেহ)।” আরেকবার বলেছেনঃ “ক্বারী হাফস বিন সুলাইমানের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই।” খতিব বাগদাদী(র.) তাঁর ‘তারিখু বাগদাদ (৯/৬৪) গ্রন্থে এই তথ্যগুলো উল্লেখ করেছেন।

 

আলিম সমাজ হাফসের হাদিস বর্ণনার সমালোচনা করেছেন এবং তা বর্জন করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি তাঁর ক্বিরাতের দক্ষতাকে দুর্বল করে না। অনেক সময় একজন আলিম কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে অত্যন্ত দক্ষ ও পারদর্শী হয়ে ওঠেন, কিন্তু একই সময়ে অন্য একটি বিষয়ে তিনি হয়তো ততটা দক্ষ হন না; ফলে সেখানে তাঁর ভুলভ্রান্তি বেশি হয় এবং তিনি ঐ বিষয়ে দুর্বল হিসেবে বিবেচিত হন।

  • খতিব বাগদাদী(র.)তারিখু বাগদাদ (৯/৬৪) গ্রন্থে বলেছেনঃ “তিনি [ইমাম হাফস] ক্বিরাতের ক্ষেত্রে [ইমাম] আসিমের সাথী এবং তাঁর সৎ ছেলে (স্ত্রীর আগের পক্ষের সন্তান)। তিনি একই বাড়িতে তাঁর সাথে থাকতেন এবং তাঁর কাছে বহু বার কুরআন পাঠ করেছেন। পূর্ববর্তী আলিমগণ তাঁকে হিফজের দিক থেকে আবু বকর ইবন আইয়াশের(র.) চেয়েও শ্রেষ্ঠ মনে করতেন এবং তাঁকে আসিম থেকে শেখা ক্বিরাতের হারফসমূহের অত্যন্ত নিখুঁত সংরক্ষণকারী হিসেবে বর্ণনা করতেন।
  • ইমাম যাহাবী(র.)মিযানুল ইতিদাল (পৃ. ২১২১) গ্রন্থে বলেছেনঃ “তিনি [ইমাম হাফস] দীর্ঘকাল মানুষকে (কুরআন) পড়িয়েছেন। ক্বিরাতের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সুপ্রতিষ্ঠিত, তবে হাদিসের ক্ষেত্রে দুর্বল। কারণ তিনি হাদিস ভালোভাবে আয়ত্ত করেননি, বরং কুরআনকে আয়ত্ত করেছেন এবং তা সুন্দরভাবে তিলাওয়াত করেছেন। এ ছাড়া ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন সত্যবাদী।
  • যাহাবী(র.) তাঁরতারিখুল ইসলাম (১১/৪৫) গ্রন্থে আরও বলেছেনঃ “হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে তাঁর ভেতরে দুর্বলতা প্রবেশ করেছে মূলত এ বিষয়ে তাঁর উদাসীনতার কারণে।
  • ইবন আব্দুল হাদী(র.)আস সারিমুল মুনকি (পৃ. ৬৩) গ্রন্থে বলেছেনঃ “আবু উমার হাফস বিন সুলাইমান আল আসাদী আল কুফী আল ক্বারী আল-গাদিরী ছিলেন ক্বিরাতের ক্ষেত্রে আসিম বিন আবি নাজুদের সাথী এবং তাঁর সৎ পুত্র। তিনি ক্বিরাত জানা ও তা বর্ণনার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। কিন্তু হাদিসের ক্ষেত্রে তিনি এ শাস্ত্রের (সুদক্ষ) লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না এবং তাঁর [হাদিস] বর্ণনার উপর নির্ভর করা হয় না।
  • খাযরাজী(র.)খুলাসাতু তাহযিবিল কামাল (পৃ. ৮৭) গ্রন্থে বলেছেনঃ “ক্বিরাতের ক্ষেত্রে সর্বসম্মতিক্রমে তিনি [ইমাম হাফস] অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য।
  • ইবন হাজার আল আসকালানী(র.)আত তাক্বরিব’ (পৃ. ১৪০৫) গ্রন্থে বলেছেনঃ “তিনি হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে পরিত্যক্ত, যদিও ক্বিরাতের ক্ষেত্রে তিনি একজন ইমাম।

 

দ্বিতীয়তঃ হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে ইমাম হাফসের বিরুদ্ধে আনীত মিথ্যা বলার অভিযোগের খণ্ডন

তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার যে অভিযোগ তোলা হয়, সেটি মূলত ইবন মাঈন এবং ইবন খিরাশ থেকে বর্ণিত হয়েছে।

 

ইবন মাঈনের বক্তব্যঃ ক্বারী হাফস বিন সুলাইমান(র.) সম্পর্কে ইবন মাঈন(র.) থেকে তিনটি বর্ণনা পাওয়া যায়ঃ

 

প্রথম বর্ণনাঃ তিনি বলেছেনঃ "সে নির্ভরযোগ্য (সিকাহ) নয়।"
ইবন মাঈনের এই উক্তিটি দারিমী(র.) 'তারিখ ইবন মাঈন' (পৃ. ২৬৯) গ্রন্থে এবং আবু কুদামা আস সারখাসি(র.) 'আল জারহ ওয়াত-তা’দিল' (৩/১৭৩) গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।

 

দ্বিতীয় বর্ণনাঃ তিনি বলেছেনঃ "সে উল্লেখযোগ্য কিছু নয়।"
এটি উকাইলি 'আদ দু’আফা' (পৃ. ৫) গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল হামিদ আস সাহমি আমাদের বলেছেন, তিনি বলেনঃ আহমাদ বিন মুহাম্মাদ আল-হাদরামি আমাদের বলেছেন, তিনি বলেনঃ "আমি ইয়াহইয়া বিন মাঈনকে হাফস বিন সুলাইমান আবু উমার আল বাযযায সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম? তিনি বললেনঃ সে উল্লেখযোগ্য কিছু নয়।"

 

তৃতীয় বর্ণনাঃ তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার অভিযোগ
ইবন মুহরিজ 'মা'রিফাতুর রিজাল' (পৃ. ৫৪৬) গ্রন্থে এটি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ "আমি ইয়াহইয়া [ইবন মাঈন]কে বলতে শুনেছিঃ আইউব বিন মুতাওয়াক্কিল (যিনি একজন অভিজ্ঞ ক্বারী ছিলেন) আমাকে বলেছেনঃ আবু বকর বিন আইয়াশের চেয়ে আবু উমার আল বাযযযের (হাফস) ক্বিরাত অধিক সুদৃঢ়, তবে আবু বকর তার চেয়ে বেশি সত্যবাদী। ইয়াহইয়া বলেনঃ এই আবু উমার একজন মিথ্যাবাদী।"

 

ইবন আদি(র.)ও তাঁর 'আল কামিল' (৩/২৬৮) গ্রন্থে এটি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ “আস সাজি আমাদের জানিয়েছেন, আহমাদ বিন মুহাম্মাদ আল বাগদাদী আমাদের বলেছেন, আমি ইয়াহইয়া ইবন মাঈনকে বলতে শুনেছিঃ "হাফস বিন সুলাইমান এবং আবু বকর বিন আইয়াশ আসিমের ক্বিরাত সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জানতেন। হাফস আবু বকরের চেয়ে বড় ক্বারী ছিলেন, তবে আবু বকর ছিলেন সত্যবাদী এবং হাফস ছিলেন মিথ্যাবাদী।"


প্রকাশ্যভাবে বোঝা যায় এটি একটিই বর্ণনা এবং ইবন মাঈন থেকে এর বর্ণনাকারীও একজনই। কারণ
'ইবন মুহরিজ' এবং 'আহমাদ বিন মুহাম্মাদ আল বাগদাদী' মূলত একই ব্যক্তি। হাফিজ ইবন হাজার(র.) তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থের বহু স্থানে এই মতটিই প্রধান্য দিয়েছেন। তিনি আস সাজি থেকে তাঁর শিক্ষক আহমাদ বিন মুহাম্মাদ আল বাগদাদীর সূত্রে বর্ণনা করার সময় বলেনঃ "তিনিই হলেন ইবন মুহরিজ।" যেমন তাহযিব আত তাহযিব (১১/২১৩), (৯/৩২৬), (১১/৩৮৩)-এ উল্লেখ আছে।

 

এই ইবন মুহরিজ (আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বিন কাসিম বিন মুহরিজ) সম্পর্কে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরও কোনো আলিম তাকে 'সিকাহ' বা নির্ভরযোগ্য বলেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং খতিব বাগদাদী তাকে মাজহুল বা অজ্ঞাত বলে গণ্য করেছেন।

 

খতিব বাগদাদী(র.) 'তারিখু বাগদাদ' (২/৭) গ্রন্থে বলেনঃ "কিছু আলিম উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম মালিকের সমসাময়িক একদল আলিম তার সমালোচনা করেছেন এই কারণে যে, তিনি এমন কিছু লোক সম্পর্কে মন্তব্য করতেন যারা সততা ও বিশ্বস্ততার জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি এর প্রমাণ হিসেবে যা আল বারকানী আমাকে জানিয়েছেন তা উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেনঃ মুহাম্মদ ইবন আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল মালিক আল আদামী আমাকে বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেনঃ মুহাম্মদ ইবন আলী আল ইয়াদী আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেনঃ যাকারিয়া আস সাজি আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেনঃ আহমাদ বিন মুহাম্মাদ আল বাগদাদী আমাকে বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেনঃ ইব্রাহিম ইবন আল মুনযির আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেনঃ মুহাম্মাদ ইবন ফুলাইহ আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেনঃ মালিক ইবন আনাস আমাকে বলেছেনঃ “হিশাম ইবন উরওয়া একজন মিথ্যাবাদী। [অথচ বাস্তবিক তিনি আদৌ মিথ্যাবাদী না বরং সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত]।

আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ বলেনঃ তারপর আমি ইয়াহইয়া ইবন মাঈনের কাছে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেনঃ “সম্ভবত তিনি সাধারণ কথাবার্তার ক্ষেত্রে এ কথা বলেছেন; কিন্তু হাদিসের ক্ষেত্রে তিনি (হিশাম) বিশ্বস্ত, এবং তিনি তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন।

খতিব (বাগদাদী) মন্তব্য করে বলেনঃ "ইবন ইসহাক সম্পর্কে ইমাম মালিকের সমালোচনা অত্যন্ত প্রসিদ্ধ এবং হাদিস বিশারদদের কারো কাছেই তা গোপন নয়। কিন্তু হিশাম বিন উরওয়াহ সম্পর্কে ইবন ফুলাইহের এই বর্ণনাটি আমাদের উল্লেখ করা এই সূত্র ছাড়া আর কোথাও সংরক্ষিত (মাহফুজ) নেই। আর ইব্রাহিম বিন মুনজির থেকে এর বর্ণনাকারী আমাদের কাছে অপরিচিত [অর্থাৎ অপরিচিত বর্ণনাকারীর এই বর্ণনা সহীহ নয়]। আল্লাহই ভালো জানেন।"

 

মু’আল্লিমি আল ইয়ামানী(র.) খতিব বাগদাদীর(র.) এই বক্তব্যের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে তার 'আত তানকিল' (১/১৯৭) গ্রন্থে বলেনঃ "বাগদাদের এমন একজন বর্ণনাকারী যাকে খতিব বাগদাদী চেনেন না, অথচ খতিব তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় বাগদাদী বর্ণনাকারীদের অনুসন্ধানে ব্যয় করেছেন - সে নিশ্চিতভাবেই মাজহুল বা অজ্ঞাত।"

 

এ বর্ণনাটিকে দুর্বল করে এমন বিষয়গুলোর মধ্যে আরেকটি হলো, যা খতিব বাগদাদী(র.) তাঁর ‘তারিখু বাগদাদ’ (৯/৬৪)-এ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ আমাদেরকে আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ আল কাতিব সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেনঃ আমাদেরকে মুহাম্মাদ ইবন হুমায়দ আল মাখরামী সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেনঃ আমাদেরকে আলী ইবনুল হুসাইন ইবন হিব্বান বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেনঃ আমি আমার পিতার কিতাবে, তাঁর নিজ হাতের লেখায় পেয়েছি যে, আবু যাকারিয়া অর্থাৎ ইয়াহইয়া ইবন মাঈন বলেনঃ আইউব ইবন মুতাওয়াক্কিল দাবি করেছেন যে, ক্বিরাতের ক্ষেত্রে আবু বকর ইবন ‘আইয়াশের চেয়ে অধিক শুদ্ধ আবু উমার আল বাযযাযআর আবু বকর আবু উমারের চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য।

আবু যাকারিয়া বলেনঃ আইউব ইবন মুতাওয়াক্কিল ছিলেন বসরার একজন কারী; আমি তাকে এ কথা বলতে শুনেছি।

 

এই বর্ণনায় লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইবন মাঈন এখানে হাফস ইবন সুলাইমানকে মিথ্যাবাদী বলেননি; বরং তিনি বলেছেনঃ “আবু উমারের চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য আবু বকর,অর্থাৎ এখানে আবু উমার বলতে হাফস বিন সুলাইমানকে বোঝানো হয়েছে।

 

এই বর্ণনার প্রেক্ষাপট ইবন মুহরিজের বর্ণনার মতোই, কিন্তু এর বর্ণনাকারী হুসাইন বিন হিব্বান একজন প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য (সিকাহ) ব্যক্তি। খতিব বাগদাদী 'তারিখু বাগদাদ' (৮/৫৬৪) গ্রন্থে তার জীবনীতে লিখেছেনঃ "তিনি ইয়াহইয়া ইবন মাঈনের ছাত্র ছিলেন, অত্যন্ত গুণী ও ইলমে অগ্রগামী ব্যক্তি ছিলেন। ইয়াহইয়ার সূত্রে তাঁর একটি অত্যন্ত মূল্যবান গ্রন্থ রয়েছে। তাঁর পুত্র আলি ইবনুল হুসাইন সেই গ্রন্থটি তার পিতার কাছ থেকে 'উইজাদাহ' পদ্ধতিতে (লিখিতভাবে প্রাপ্তির মাধ্যমে) বর্ণনা করেছেন।"

 

সুতরাং, নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী দারিমীর(র.) বর্ণনাটিই অন্যদের বর্ণনার ওপর অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। ইয়াহইয়া ইবন মাঈন থেকে হাফস(র.) সম্পর্কে প্রমাণিত বিষয়টি হলো - তিনি হাফসকে হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে 'মাতরুক' (পরিত্যাজ্য) গণ্য করতেন। আর তাঁকে মিথ্যাবাদী বলার যে অভিযোগ, সেটি নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে প্রমাণিত নয় যা দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।


ইবন খিরাশ (আব্দুর রহমান বিন ইউসুফ বিন খিরাশ) থেকে হাফস বিন সুলাইমানকে মিথ্যাবাদী এবং হাদিস জালকারী (ওয়াজ্জা) বলার যে দাবি বর্ণিত হয়েছে, তা দু’টি কারণে প্রত্যাখ্যাতঃ

 

প্রথমতঃ

তাঁর থেকে আসা এই বর্ণনাটিই প্রশ্নবিদ্ধ, কারণ এর সনদে একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি আছে।

খতিব বাগদাদী(র.) তাঁর সনদসহ এটি তাঁর 'তারিখু বাগদাদ' (৯/৬৪) গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ "আলি ইবন তালহা আল মুক্বরী আমাদের জানিয়েছেন, তিনি বলেনঃ মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহিম ইবন ইয়াযিদ আল গাজি আমাদের জানিয়েছেন, তিনি বলেনঃ মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন দাউদ আল কারাজি আমাদের জানিয়েছেন, তিনি বলেনঃ আবদুর রহমান ইবন ইউসুফ ইবন খিরাশ আমাদের বলেছেন, তিনি বলেনঃ "হাফস বিন সুলাইমান মিথ্যাবাদী, পরিত্যাজ্য, সে হাদিস জাল করে।"

 

ইবন খিরাশ পর্যন্ত এই সনদের মধ্যে মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন দাউদ আল কারাজি নামক একজন বর্ণনাকারী আছেন, যিনি মাজহুল বা অজ্ঞাত। সামআনী(র.) তাঁর 'আল আনসাব' (১১/৬৬) গ্রন্থে এবং ইবন হাজার(র.) তাঁর 'তাবসিরুল মুনতাবিহ' (৩/১২০৯) গ্রন্থে তার নাম উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তার সম্পর্কে কোনো জারহ (সমালোচনা) বা তা'দিল (প্রশংসা) উল্লেখ করেননি।

 

দ্বিতীয়তঃ

এই বক্তব্যটি যদি ইবন খিরাশের থেকে সহীহভাবে বর্ণিত হওয়াও ধরে নেওয়া হয়, তবুও তার সেই বক্তব্য দু’টি কারণে প্রত্যাখ্যাতঃ

 

১।

তার [ইবন খিরাশ] বিরুদ্ধে ‘রাফিযি’ (চরমপন্থী শিয়া) হওয়ার অভিযোগ রয়েছে এবং এটি তার ব্যাপারে একটি প্রমাণিত বিষয়।

 

ইবন ‘আদি(র.) তাঁর ‘আল কামিল’ গ্রন্থে (৫/৫১৯) আবদান আল আহওয়াযি থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ “ইবন খিরাশ আমাদের এখানকার বুন্দার (অর্থাৎ একজন ব্যবসায়ী বা ধনবান ব্যক্তি) এর কাছে [১টি গ্রন্থের] দু’টি খণ্ড নিয়ে গিয়েছিল, যা সে দুই শায়খের [আবু বকর(রা.) ও উমার (রা.)] ত্রুটিসমূহ নিয়ে সংকলন করেছিল। ঐ ব্যক্তি তাকে দুই হাজার দিরহাম পুরস্কার দেয়। সেই টাকা দিয়ে সে বাগদাদে একটি ঘর তৈরি করে যাতে সেখানে বসে হাদিস বর্ণনা করতে পারে। কিন্তু সে তা ভোগ করতে পারেনি, ঘরটি নির্মাণ শেষ করার পরপরই সে মারা যায়।”

তিনি আরও বলেন, “আমি আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বিন সাঈদকে (যিনি ইবন উকদাহ নামে পরিচিত) বলতে শুনেছিঃ ইবন খিরাশ যখন কুফায় থাকাকালীন শিয়া মতবাদ সংক্রান্ত কিছু লিখতেন, তখন আমাকে বলতেনঃ হে আবুল আব্বাস! এগুলো আমি আর আপনি ছাড়া আর কারো কাছে চলবে না

 

এই ইবন উকদাহ শিয়া প্রবণতার জন্য পরিচিত ছিলেন। আল খালিলি(র.) তাঁর ‘আল ইরশাদ’ গ্রন্থে (২/৫৭৯) তাঁর জীবনীতে লিখেছেনঃ “আবুল আব্বাস আহামাদ বিন মুহাম্মাদ বিন সাঈদ ইবন উকদাহ আল কুফী বড় মাপের হাফিযদের অন্তর্ভুক্ত এবং তিনি শিয়াদের শায়খ (গুরু)। তার বর্ণিত হাদিসের ব্যাপারে আপত্তি রয়েছে।

 

আবদান আল আহওয়াযি ছিলেন ইবন খারাশের সমসাময়িক। ইবন খিরাশ ২৮৩ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন, যেমনটি ‘তারিখু বাগদাদ’ (১১/৫৭১)-এ উল্লেখ আছে। অন্যদিকে, আবদান আল আহওয়াযি(র.) ৩০৬ হিজরিতে ৯০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন, যা আয যাহাবী(র.) তাঁর ‘তারিখুল ইসলাম’ (৭/১০৪) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

আবদান আল আহওয়াযি(র.) সম্পর্কে খতিব বাগদাদী(র.) তাঁর ‘তারিখু বাগদাদ’ (১১/৬) গ্রন্থে বলেছেনঃ “তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য হাদিস হাফিযদের একজনতিনি শায়খদের (থেকে হাদিস) সংগ্রহ করতেন এবং সেগুলোকে বিভিন্ন অধ্যায়ে বিন্যস্ত করতেন।

হামজা বিন ইউসুফ আস সাহমী(র.) তাঁর 'সুয়ালাতুহু লিদ দারাকুতনি' (পৃ. ৩৪১) গ্রন্থে মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ আল জুরজানী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি ইবন খিরাশ সম্পর্কে বলেছেনঃ "তিনি দুই শায়খ [আবু বকর(রা.) ও উমার (রা.)] এর দোষ-ত্রুটি নিয়ে বই বের করেছিলেন এবং তিনি ছিলেন একজন রাফিযি।"

 

ইমাম যাহাবী(র.) ইবন খিরাশের এই কাজ অর্থাৎ দুই শায়খের দোষ-ত্রুটি নিয়ে গ্রন্থ রচনার বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে 'মিযানুল ই’তিদাল' (পৃ. ৫০০৯) গ্রন্থে বলেছেনঃ "আল্লাহর কসম, ইনি [ইবন খিরাশ] সেই বিচ্যুত শায়খ যার সমস্ত প্রচেষ্টা বৃথা গেছে। তিনি নিজ সময়ের একজন বড় হাফিয ছিলেন, ইলম অর্জনের জন্য দেশ-বিদেশে ব্যাপক সফর করেছেন এবং তাঁর তথ্য ও জ্ঞানের পরিধি ছিল বিশাল। কিন্তু এত কিছুর পরেও তিনি তাঁর ইলম দ্বারা উপকৃত হতে পারেননি। তাই রাফিযিদের গাধা (অজ্ঞ অনুসারী) এবং জাযিন ও মাশগারা এলাকার মূর্খদের প্রতি আর কোনো আক্ষেপ রইল না (যেখানে তিনি নিজেই এমন পথে চলেছেন)।"

এই কারণেই উলামায়ে কেরাম আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের রাবীদের (বর্ণনাকারী) প্রতি তার করা সমালোচনার (জারহ) ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন, যদি তিনি একা সেই সমালোচনা করে থাকেন।

 

ইবন হাজার আসকালানী(র.) 'লিসানুল মিযান' (১/২১২) গ্রন্থে বলেছেনঃ "যাদের জারহ (সমালোচনা) সংক্রান্ত বক্তব্য গ্রহণের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত, তারা হলো এমন ব্যক্তি যাদের সাথে তাদের সমালোচিত ব্যক্তির আকিদাগত পার্থক্যের কারণে শত্রুতা রয়েছে। একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি যখন আবু ইসহাক আল জুযজানি কর্তৃক কুফাবাসীদের প্রতি করা তীব্র সমালোচনাগুলো লক্ষ্য করবেন, তখন তিনি বিস্মিত হবেন। কারণ তিনি নাসিবি [আহলে বাইতবিরোধী এক গোষ্ঠী] ছিলেন, আর কুফাবাসীরা শিয়াপন্থার জন্য পরিচিত ছিল।

আপনি দেখবেন, তিনি (জুযজানি) কোনো দ্বিধা ছাড়াই তীক্ষ্ণ ভাষা ও সাবলীল বক্তব্যের মাধ্যমে তাদের সমালোচনা করেন। এমনকি তিনি আমাশ, আবু নুআইম এবং উবাইদুল্লাহ বিন মুসার মতো হাদিসের স্তম্ভ ও বর্ণনার খুঁটিস্বরূপ ব্যক্তিদের ব্যাপারেও নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। অতএব, যখন তার সমপর্যায়ে বা তার চেয়ে বড় মাপের কোনো আলিম তার বিরোধিতা করে যাকে তিনি দুর্বল বলেছেন সেই ব্যক্তিকে বিশ্বস্ত বা নির্ভরযোগ্য বলেন, তখন সেই তাওসিক (বিশ্বস্ততাকরণ) গ্রহণ করা হবে।

মুহাদ্দিস হাফিয আব্দুর রহমান বিন ইউসুফ ইবন খিরাশও এই শ্রেণীর মাঝে পড়েন। কারণ তিনি ছিলেন চরমপন্থী শিয়া, এমনকি তাঁর দিকে রাফিযি বলেও আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাই আহলে শামের (বৃহত্তর সিরিয়া অঞ্চল) রাবীদের বিরুদ্ধে তার করা সমালোচনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত, কারণ আকিদাগত কারণে তাদের সাথে তার প্রকাশ্য শত্রুতা ছিল।"

 

সুবকী(র.) তাঁর 'শিফাউস সিক্বাম' (পৃ. ২৫) গ্রন্থে [ইমাম হাফসকে মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করে] ইবন খিরাশের উক্তি উদ্ধৃত করার পর বলেছেনঃ "আমার মতে এই বক্তব্যটি অতিরঞ্জিত। কেননা এই ব্যক্তি [ইমাম হাফস(র.)] ক্বিরাতের একজন ইমাম। তাহলে কীভাবে ধারণা করা যায় যে তিনি হাদিস জাল করা ও মিথ্যার আশ্রয় নেবেন, যেখানে মানুষ সর্বসম্মতিক্রমে তার ক্বিরাত গ্রহণ করেছে? বড়জোর এতটুকু বলা যেতে পারে যে, তিনি হাদিসের বিশেষজ্ঞ ছিলেন না, তাই তাঁর বর্ণনায় কিছু মুনকার (অগ্রহণযোগ্য) বিষয় ও অনেক ভুল সংঘটিত হয়েছে।"

 

২।

ইবন খিরাশ জারহের ক্ষেত্রে কঠোরতার জন্য পরিচিত। তাই বর্ণনাকারীর ব্যাপারে তার এ ধরণের কঠোর মন্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।

 

ইমাম যাহাবী(র.) 'আল মুকিযাহ' (পৃ. ৮৩) গ্রন্থে বলেছেনঃ "মুহাদ্দিসদের মধ্যে কেউ কেউ জারহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর মেজাজের, কেউ মধ্যমপন্থী, আবার কেউ নমনীয়। কঠোর মেজাজের মধ্যে রয়েছেনঃ ইয়াহইয়া বিন সাঈদ, ইবন মাঈন, আবু হাতিম, ইবন খিরাশ এবং আরও অনেকে।"

 

তা ছাড়া জারহ ওয়া তা’দিল (রাবী বা বর্ণনাকারী যাচাই-বাছাই বিদ্যা) শাস্ত্রের ইমামদের নিকট এটি সুপরিচিত বিষয় যে, কোনো আলিম যখন কোনো বর্ণনাকারীর ক্ষেত্রে 'মিথ্যা' শব্দটি ব্যবহার করেন, তখন কখনো কখনো তিনি এর দ্বারা ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচার বোঝান। আবার কখনো কখনো এর দ্বারা এমন চরম গাফিলতি বা অমনোযোগিতাকে বোঝান, যার ফলে ঐ বর্ণনাকারী অনিচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বর্ণনা উদ্ধৃত করে ফেলেন।

 

ইমাম মুসলিম(র.) তাঁর 'সহীহ মুসলিম' এর মুকাদ্দিমায় (১/১৭) ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ আল কাত্তান(র.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেনঃ "আমরা নেককার মানুষদের হাদিসের ক্ষেত্রে যতটা মিথ্যা বলতে দেখেছি, অন্য কোনো বিষয়ে তেমনটা দেখিনি।"

অতঃপর ইমাম মুসলিম এই বক্তব্যের ব্যাখ্যায় বলেনঃ "তাঁদের জিহ্বা দিয়ে মিথ্যা প্রকাশ পেয়ে যায়, তবে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলেন না।"

 

কাযি ইয়ায(র.) তাঁর 'ইকমালুল মু’লিম' (১/১৩৫) গ্রন্থে বলেনঃ "এর অর্থ হলো - সহীহ হাদিস চেনা ও হাদিস শাস্ত্রের জ্ঞান কম থাকা এবং শোনা কথাগুলো হিফজ (স্মরণ) ও আয়ত্তে রাখার দুর্বলতার কারণে তারা এমন সব বর্ণনা করেন যা সহীহ নয়। তাঁরা ইবাদতে মশগুল থাকা এবং ইলমের সঠিক পথ থেকে বিমুখ হওয়ার কারণে নিজের অজান্তেই মিথ্যা বলে ফেলেন, যদিও তারা তা ইচ্ছা করে করেন না। এ প্রেক্ষাপটেই সালিহ আল মুররী এবং তাঁর মতো ব্যক্তিদের সম্পর্কে [ইমাম শাফিঈর] 'আল উম্ম' গ্রন্থে যে 'মিথ্যা' শব্দটি এসেছে, তার অর্থ হলো - ভুল করা এবং বাস্তবের বিপরীত কিছু বলা, ইচ্ছাকৃত মিথ্যা নয়।"

 

ইমাম নববী(র.) 'শারহ মুসলিম' এ (১/৯৪) বলেছেনঃ "এর অর্থ তাই যা ইমাম মুসলিম বলেছেন - অর্থাৎ তাঁদের জিহ্বা দিয়ে মিথ্যা বেরিয়ে আসে কিন্তু তারা তা ইচ্ছা করে করেন না। কারণ তাঁরা হাদিস বিশারদদের মতো এই শাস্ত্রের চর্চা করেন না। ফলে তাদের বর্ণনায় ভুল হয়ে যায় এবং তারা তা বুঝতে পারেন না; তারা মিথ্যা বর্ণনা করেন অথচ জানেন না যে এটি মিথ্যা। আমরা ইতিপূর্বেও উল্লেখ করেছি যে, আহলে হকের (সত্যের অনুসারীদের) মাযহাব বা মতানুসারে 'মিথ্যা' হলো কোনো বিষয়কে তার প্রকৃত অবস্থার বিপরীতে প্রকাশ করা - তা ইচ্ছাকৃত হোক, অনিচ্ছাকৃত হোক বা ভুলবশত হোক।"

 

সারকথাঃ

হাফস বিন সুলাইমান আল ক্বারী(র.) ক্বিরাত শাস্ত্রের একজন নির্ভরযোগ্য ইমাম। কিন্তু হাদিস শাস্ত্রের ক্ষেত্রে তিনি 'মাতরুক' (পরিত্যক্ত), অর্থাৎ তাঁর বর্ণিত হাদিস গ্রহণ করা হয় না। তবে তাঁর ওপর ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচারের যে অপবাদ দেওয়া হয়, তা ভিত্তিহীন, যা আমরা ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি। একজন আলিম কোনো একটি নির্দিষ্ট শাস্ত্রে অত্যন্ত দক্ষ ও পারদর্শী হতে পারেন এবং সেই শাস্ত্রে তাঁর কথা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। আবার তিনিই হয়তো অন্য কোনো শাস্ত্রে দক্ষ নন এবং সেখানে তাঁর ভুলভ্রান্তি বেশি হওয়ার কারণে সেই শাস্ত্রে তাঁর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হয় না।

 

ইমাম যাহাবী(র.) তাঁর 'তাযকিরাতুল হুফফায' (৩/১৫৭) গ্রন্থে কতই না চমৎকার কথা বলেছেনঃ

"নুহ আল জামি’ বড় মাপের আলিম হওয়া সত্ত্বেও হাদিসের ক্ষেত্রে তাঁকে পরিত্যাগ করা হয়েছে। তেমনি তাঁর উস্তাদও অত্যন্ত ইবাদতগুজার হওয়া সত্ত্বেও একই অবস্থায় ছিলেন। কত এমন ইমাম আছেন যাঁরা এক শাস্ত্রে পারদর্শী হলেও অন্য শাস্ত্রে পিছিয়ে। যেমনঃ সিবাওয়াইহ নাহু (ব্যাকরণ) শাস্ত্রের ইমাম ছিলেন, কিন্তু হাদিস সম্পর্কে তাঁর বিশেষ জ্ঞান ছিল না। ওয়াকী' হাদিস শাস্ত্রের ইমাম ছিলেন, কিন্তু আরবি শাস্ত্রে তাঁর দখল ছিল না। আবু নুওয়াস কাব্য জগতের শীর্ষস্থানীয় হওয়া সত্ত্বেও অন্য বিদ্যায় শূন্য ছিলেন। আবদুর রহমান বিন মাহদি হাদিসের ইমাম ছিলেন কিন্তু চিকিৎসা শাস্ত্র সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। মুহাম্মাদ বিন হাসান [ইমাম আবু হানিফা(র.) এর বিখ্যাত ছাত্র] ফিকহ শাস্ত্রের শীর্ষস্থানীয় হওয়া সত্ত্বেও ক্বিরাত সম্পর্কে তাঁর বিশেষ জ্ঞান ছিল না। ঠিক তেমনি হাফস বিন সুলাইমান ক্বিরাত শাস্ত্রের ইমাম হলেও হাদিসের ক্ষেত্রে তিনি দুর্বল। আসলে প্রত্যেক যুদ্ধের জন্যই আলাদা আলাদা বীর যোদ্ধা থাকে (অর্থাৎ প্রতিটি শাস্ত্রের জন্য আলাদা বিশেষজ্ঞ থাকেন)।"

এবং আল্লাহই সর্বোত্তম জানেন।

 

মূল ফতোয়ার লিঙ্কঃ

○ আরবিঃ https://islamqa.info/ar/340336/

○ অথবা (আর্কাইভকৃত)

https://archive.is/wip/7i99B

https://web.archive.org/web/20260405162758/https://islamqa.info/ar/answers/340336

 

আরো পড়ুনঃ 

 

সাত হারফ কি কুরআনের একাধিক ভার্সন?

 

 

কুরআনের ৭ হারফ এবং ১০ কিরাআত - ইবন তাইমিয়া(র.)

 

সুরা বাকারাহর ১৮৪ নং আয়াতে ভিন্ন কিরাতগুলোতে কি আসলেই ভিন্ন তথ্য আছে?

 

উসমান(রা.) সংকলিত কুরআনের কপিতে আসলেই কি লিপিকারদের ভুল (Scribal Errors) বা ব্যাকরণগত ভুল ছিলো?

 

 

কুরআন কি ঠিকভাবে সংরক্ষিত নেই?

 

সোশ্যাল লিঙ্ক ও অ্যাপ

সর্বাধিক পঠিত

সর্বশেষ পোস্টসমূহ